বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বামেরা মূলত ডান। কীভাবে, তা বোঝার জন্য, আপনি আঠার শতকের শেষদিকে ফ্রেঞ্চ রেভলুশনের সময়ের মত কইরা জুলাই অভ্যুত্থানের পরে নতুন ব্যবস্থা ও সংবিধানের পক্ষে এবং বিপক্ষে একটা ন্যাশনাল এসেম্বলি কল্পনা করুন, যা হইতে পারল না, বা ভবিষ্যতে হবে। আপনাগো ডান বাম মিথ তো এখান থেকেই শুরু। তো, দেখবেন, এই ন্যাশনাল এসেম্বলিতে, এখনকার ঐতিহাসিক ও বুড়ো বামেরা, এসেনশিয়ালি, প্রেসিডেন্টের ডানপক্ষেই, মানে হাসিনার রেখে যাওয়া ব্যবস্থার পক্ষেই লয়াল হিশেবে বসবেন, সংবিধানে হাত দিলে কল্লা নেওয়ার কথা বলবেন। আশ্চর্য হবেন, এখনকার ডানদের বড় অংশরে, ঐক্যমত কমিশনের আলাপে যেভাবে দেখা গেছে, মোটামুটি নতুন ব্যবস্থার পক্ষের সারিতেই, প্রেসিডেন্টের বামপাশে পাবেন। তো, যদি ডান ও বাম বইলা পুরনো পলিটিকাল বলয়ের ব্যবহারকে মূল্য দিতে চান, এখন তো নতুন ডান ও বাম ডিফাইন হবার সময়ই।
বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বামেরা মূলত ডান শুধু নয়, ডানের সব চরিত্রই উনারা ধর্মের মত কইরা আইডিওলজি ও রাজনীতিতে ধারণ করেন। যেমন‚ এক্সট্রিম ন্যাশনালিজম। দেখবেন, ওরা হাড়ে মজ্জায় এক্সট্রিম ন্যাশনালিস্ট। বাঙালি জাতীয়তাবাদী অর্থে, যারে আপনি ইন্ডিয়ান জাতীয়তাবাদ হিশেবেও পড়তে পারবেন, কোন কোন ক্ষেত্রে। ন্যাশনালিজম যে একটা রাইট উইং ফেনোমেনন, এইটা উনারা জানেন না, তা হওয়া সম্ভব না। উনারা প্রচুর পড়াশোনা করা মানুষ। কিন্তু ওরা বেঙ্গলি ন্যাশনালিস্ট, এবং একই সাথে নিজেদেরকে বাম মনে করেন। আর, তার বিপরীতে, ট্রেডিশনাল ডান কিন্তু সেই অর্থে ন্যাশনালিজম সাবস্ক্রাইব করে না বইলাই মনে হয়। ওদের বেশির ভাগই, গ্লোবাল ইসলামিজম ধরনের কোন আইডিয়া সাবস্ক্রাইব করে, আন্তর্জাতিকতাবাদ, যেটি কোন না কোনভাবে এসেনশিয়ালি বাম ফেনোমেনন হিশেবেই পাবেন। ওরা এমনকি মুসলমান জাতীয়তাবাদরেও প্রবলেমাটাইজ করে, আমি খেয়াল করেছি। যদিও‚ এইটারে নিয়া ওদের নিজেদের ভেতরেই নানান তর্ক আছে।
দ্বিতীয়ত‚ এই ন্যাশনালিস্ট আইডিওলজি ছাড়াও‚ আরো অনেক অর্থেই‚ বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বামেরা মূলত ডান। যেমন, ওরা রাজনীতিতে সবচাইতে রক্ষণশীল, শুরুতে কওয়া সেই প্রেসিডেন্টের ডান পাশের সারি, পুরনো এসটাবলিশমেন্টগুলোর ঐতিহ্য, যেমন ৭২ এর সংবিধানকে পূজা করে‚ একাত্তর বিষয়ে মুজিব প্রবর্তিত ধর্মযুদ্ধকে লালন করে, তার থিকা বেরুনোর যে কোন ধরনের প্রশ্নরে ধর্মীয় গোষ্ঠিগুলোর মতই 'পাপ' মনে করে, তার সব ময়লা টুলটেবিল, যেমন ঘেন্নাবাদসহই ঔন করে।
আরো ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, বাংলাদেশে বহু বছর ধরে এই ঘেন্নাবাদকেই রাজনীতি হিসেবে প্রচার করেছে এই বামেরা‚ বাকিগুলোরে ডান প্রবণতা হিশেবে চিহ্নিত করেছে, এক্সট্রিম ডান আওয়ামীলীগের হয়ে। সবক্ষেত্রে রক্ষণশীল এবং ফার রাইট আওয়ামীলীগের আইডিওলজি এবং রাজনৈতিক স্বার্থ সংরক্ষণ করারেই কর্তব্য মনে করেছেন উনারা। বিপরীতে, ট্রেডিশনাল ডান পন্থাগুলোরে, দেখবেন, প্রবল আদর্শবাদি ফ্যানেটিক হওয়া সত্ত্বেও, কোন কোন সময় প্রগ্রেসিভ ও সংস্কারপন্থি, মানে বাম, হাহা, অবস্থানেই দেখা গেছে। যেমন, শুরুতে, জাতীয় ঐক্যমত কমিশনের বৈঠকগুলোর কথা বললাম। এইটা, যদিও, তাদের রাজনীতির একমাত্র পরিচায়ক না।
এই একই বৈঠকগুলোতে, ট্রেডিশনাল বামেরা, দেখবেন, সব সময়ই ডানপন্থি, রক্ষণশীল, পুরনো মূল্যবোধ আঁকড়ে ধরার ব্যাপার নিয়াই একটিভ থেকেছেন। কোন লজ্জা ও দ্বিধা ছাড়াই। ফলে, আমি বহুদিন ধরে বলছি, এখানকার বাম হল, ডানের মতই আইডিওলজিকাল ফেনেটিসিজম। যদিও, উভয় গ্রুপই অনেক ক্ষেত্রেই এসেনশিয়ালি প্রতিক্রিয়াশীলও বটে, এবং, নিজ নিজ টুল ব্যবহার করে ফ্যাসিস্ট হিশেবেও বিরাজ করে। যেমন, এক গ্রুপ হল, ধর্মীয় অনুভূতি বা অবমাননা ধরনের ঘটনাগুলো নিয়া বেশি তৎপর থাকেন রাজনীতিতে, ফ্যাসিস্ট হিশেবে, আর অপর গ্রুপ ফ্রেঞ্চ সেকুলারিজমের মত কইরাই মনে করে, রসুল বা ধর্মের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রচার করার অধিকার তাদের থাকা উচিত। এবং এই অধিকারের বিরুদ্ধের লোকেদের কোন নাগরিক অধিকার থাকা উচিত না। ফলে, এক গ্রুপ হল ধর্মীয় জায়গা থেকে ফ্যাসিস্ট, কোন কোন সময় গণখবরদারিও উৎপাদন করে, আর এক গ্রুপ ফ্যাসিস্ট হল, জাতীয়তাবাদের জায়গা থেকে। এই জাতীয়তাবাদের জায়গা থেকেই, এই ঐতিহাসিক বামদেরই কেউ একজন, সংসদে বইসা, প্রয়োজনে লক্ষ লক্ষ লোককে মেরে ফেলার কথা কইছিলেন, বেঙ্গলি নেশনালিস্ট ভেলু ব্যবস্থা রক্ষা করার জন্য। মনে আছে?
তো, এই জায়গায় এসে আমার ফুটনোট হল, আমি এই উভয় ফেনেটিসিজমকে ডিজঔন করি, সচেতনভাবে। আমি সমাজে গণঘৃণার চর্চা ও ভেলু হিশেবে এর প্রচারের বিরুদ্ধে। ধর্ম বলুন, জাতীয়তাবাদ বলুন, সেকুলারিজম বলুন, সবেরই ফ্যাসিস্ট সম্ভাবনা নিয়া এওযার থাকারে গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। ডান আর বাম, স্রেফ এই দুই প্রান্ত দিয়ে রাজনীতি ও মতাদর্শরে ডিফাইন করা সম্ভব না মনে করি‚ এখনকার দুনিয়ায়। ডান আর বাম, এইটা উপরের কওয়া সেই ইউরোপের ফেনোমেনা, যা ইতিহাসের সাথে, এবং দুনিয়ার অপরপ্রান্তগুলোতে আসতে আসতে এমন ব্লারড হয়ে গেছে যে, আপনি ডানদের তেকে বামকে, আর বামদের থেকে ডানকে আলাদাই করতে পারবেন না। ফলে, এই বাম আর ডান, অর্থহীনই। বরং, এইখানে আমার পক্ষের ধারণা নিয়া আর একটু ইশারা দিই।
আমি বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বাম এবং ঐতিহাসিক ডানের রাজনীতির সমালোচক ছিলাম সব সময়, এখনো আছি। যদিও উভয় গ্রুপের প্রতি ঐতিহাসিক দায়ের অংশ ও স্নেহের অংশ হিশেবে, যখন শাহবাগের আজান লিখলাম, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনালকে আওয়ামীলীগ এবং ঐতিহাসিক বামপন্থাগুলোর ইসলাম প্রশ্ন মোকাবেলার টুল হিশেবে চিহ্নিত করলাম, মতিঝিল হত্যাকাণ্ড আর শিবির সন্দেহে উইচহান্টিং এর সমালোচনা করলাম, একাত্তর প্রশ্নে মুজিবের তৈরী ধর্মযুদ্ধ থেকে বেরুনোর কথা বললাম, তখন একটা গ্রুপের জন্য ফার রাইট, হেফাজতি আর জামাতি হওয়ার দরকার হল আমার। আমি, সচেতনভাবে বরণ কইরা নিলাম।
আবার, যখন, জামাতের রাজনীতিতে অবস্থান পরিবর্তনের থিসিস না থাকার সমালোচনা করলাম, ইসলামী রাষ্ট্রবাদীদের ধর্মরাষ্ট্রসম্ভাবনাগুলোরে নাকচ করলাম, হেফাজত ও ইসলামিস্টদের নারী প্রশ্নের ডিলিংসরে সভ্যতার পুরুষতন্ত্র বললাম, কাউরে শাহবাগি ট্যাগ দিয়া আদারিং এর বিরোধিতা করলাম এবং জুলাই অভ্যুত্থানকে সবার একটা ফেরার পথ হিশেবে চিহ্নিত করলাম, যেখানে, গ্রে এরিয়ার থেকে বের হয়ে, অবস্থান পরিবর্তনের থিসিসের সাধ্যমে শাহবাগের একদা সমর্থকদেরও একটা পথই তৈরী হবার কথা কইলাম, তখন, কারো কারো কাছে, আমার শাহবাগি, এমন কি ইসলামোফোবও হওয়ার দরকার পড়ল। তাও, আমার বরণ করতে দ্বিধা নাহি ছিল।
কারণ, এই উভয় ঘটনাই আমার সচেতন রাজনৈতিক চয়েস, বিবেচনা ও পক্ষ, যে বিবেচনা ও পক্ষ আপনাদের পরিচিত বাংলাদেশের রাইট, ফার রাইট বা লেফট এর কুয়াগুলো কখনোই নিজের রাজনৈতিক বিবেচনায় নিতে পারে নাই। মনে করার কারণ নেই, যে, আলাদা আলাদা কুয়াগুলোর ভেতর থেকে আমার প্রতি এই যে হেফাজতি বা শাহবাগি কয়ে স্বস্তি পাবার ঘটনা, আমি এর কোনটারই অনিচ্ছুক, দুর্বল ভিকটিম। বরং আমিই কর্তাসত্তা, যেইটা আমার সচেতন পছন্দ ছিল। যেমন, ট্রাইবুনালের বিচার শুরুর পরে, আমি নিজেরে কিছুটা আওয়ামীলীগ ও শেখ হাসিনারও পক্ষ হিশেবে ঘোষণা দিয়েছিলাম, যেহেতু আমি শত্রুরও সর্বোচ্চ জাস্টিসের অধিকারের পক্ষে, বিচারিক বা বিনা বিচারে এসাসিনেশনের বিপক্ষে। যুদ্ধাপরাধ বিচারের সময়েও যেভাবে, তখনকার বিচারিক হত্যাকাণ্ডগুলোর সমালোচক ছিলাম।
রাষ্ট্রীয় পরিসরে, আদর্শিক জায়গা থিকা আমি যে কোন পিউরিটান, যেমন আপনাদের পরিচিত ডান ও বামের মত মৌলবাদকে প্রত্যাখ্যান করি। ধর্মরাষ্ট্র বা ধর্মীয় শক্তি নয়, রাষ্ট্রের ভেতরে উদার ধর্মীয় টলারেন্ট সোসাইটি চাই আর ধার্মিকদেরকে আদার কইরা যে সেকুলার রাষ্ট্র, তার বাইরে আইসা ধার্মিকদেরও সেকুলার প্লাটফর্ম হিশেবে যে রাষ্ট্র তৈরী হবে, আমার আলাপ সেই রাষ্ট্রের জন্য।
যেহেতু বুদ্ধিজীবী হিশেবে আমি স্বাধীন মানুষই, পার্টিজান ও আদর্শিক কুয়াগুলোতে ঢুইকা পড়ে থাকারে আমি অকর্মার কাজ মনে করি। তবে, আমার এই ভাবের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কোন কোন ফর্মে বিরাজ করে, বর্তমানে। যেমন, একদা বিএনপিকে ধার্মিকদের সেকুলার প্লাটফর্ম হিশেবে চিহ্নিত করতাম। কিন্তু, বহু বছর ধইরা মজলুম ও ক্ষমতার বাইরে থাকার পরে, তাদের নয়া চেহারা কী হচ্ছে, তা এখনো আমরা জানি না। এখন, গণঅভ্যুত্থান থিকা ওঠে আসা ছাত্রদের দল এনসিপি একটা না-বাম না-ডান মডার্ন রাষ্ট্রধারণা নিয়া তর্ক ও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তারা নতুন সংবিধান নিয়ে কথা বলে যাচ্ছে। তাদের এই চেষ্টার প্রতি আমি এই মুহূর্তে সবচেয়ে আগ্রহী। ইতিহাসে আর কোন রাজনীতির প্রতি আমি এইভাবে আগ্রহী হয়ে উঠতে পারি নাই। এর কারণ, গণঅভ্যুত্থান ও এর দার্শনিক মুহূর্ত, যা আর কেউ তেমন কইরা ধারণ করতে সক্ষম না এই মুহূর্তে। এবি পার্টি নামে রাজনৈতিক দল ইদানীং আমার খুব আগ্রহ কুড়িয়েছে, তাদের নেতা ফুয়াদ ইদানীং বেশ পরিস্কার কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে পারছেন, যা রক্ষণশীল বাম দলগুলো, বা ডানদের পক্ষে কখনোই সম্ভব না। তাদের ব্যাপারে আগ্রহের আর একটা কারণ হল, জামায়াতের ইসলামপন্থা থিকা বের হয়ে তারা একটা সেকুলার কল্যাণরাষ্ট্রের কথা বলে রাজনীতি শুরু করেছে এবং গণঅভ্যুত্থানে তাদের বড় অবদানের কথা বলা হয় পত্রিকাগুলোতে। গণঅভ্যুত্থানের সময় মিছিল থেকে তাদের নেতা মঞ্জু গ্রেফতার হইছিলেন। গণসংহতি ও রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলন নামে দুটি অল্প পুরনো দল আছে, যাদের সাথেও কোন কোন জায়গায় আমার ঐক্যসম্ভাবনা থাকবে। সম্ভবত, এই উভয় দলের প্রধানরাও গণঅভ্যুত্থানের সময়ে একই মিছিল থেকে গ্রেফতার হন। ডাক্তার শফিকের নেতৃত্বে জামাতের বর্তমান যে চেহারা, তারে আমি জামাতের সেকুলারাইজেশনের পথে ভ্রমণ হিশেবে দেখি। জামাতের এই পথ কোথায় গিযে শেষ হয়, তা আমি বুঝতে আগ্রহী। একই সাথে, একাত্তর পরবর্তি জামাতের রাজনীতিতে যে অবস্থান পরিবর্তনের থিসিস নেই, তারে সব সময় মনে রাখব। এই ব্যাপারটা, জামাত আমাদেরকে ভুলতে না দেবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এখনতক, এহ বাহ্য ও গূঢ়।
এর বাইরে, সমাজে বিদ্যমান ডান ও বামপন্থা নিয়া আমার অবস্থান ঠাট্টামূলক। আপনারা তো জানেন।
....
ছবিটা সম্ভবত, ফ্রেঞ্চ রেভলুশনের পরের ন্যাশনাল এসেম্বলিরে আঁকা হইছে। গুগল খিকা।
No comments yet. Be the first!