চার. ভারত প্রশ্ন
[ সাম্প্রতিক দিনগুলোতে, দেখা যাচ্ছে, বিএনপি, জামাত, এনসিপি তিন গ্রুপই ভারত প্রশ্ন নিয়া আলাপে আগ্রহ দেখিয়েছে। মির্জা ফখরুল 'এই সময়' নামে মিডিয়ায়, ডাক্তার তাহের কোন এক ভারতীয় অধ্যাপকের সাথে, আর নাহিদ, তাও, 'দ্য উইক' নামে কোন এক ভারতীয় মিডিয়ার সাথে। এই সময়ে আইসা, আসেন, পুনপাঠ করি, এদের কার ভারত প্রশ্নটি কেমন, ভারত প্রশ্ন নিয়া আমাদের নিজেদের আগ্রহের জায়গা থেকে। নিচের লেখাটি গণঅভ্যুত্থানের পরপর আগস্টে লেখা 'আফটার ফ্যাসিস্ট পলিটিকাল মেনিফেস্টো' নামের লেখায় আমাদের অভ্যুত্থান পরবর্তি রাজনৈতিক ইশতেহার কেমন হওয়া দরকার, তার আলাপ এর অংশ। পুরো লেখাটির লিঙ্ক কমেস্টে দিচ্ছি। ]
ভারত আমাদের সীমান্ত। বাণিজ্য থেকে শুরু করে পানি, সীমান্তহত্যা, সব ইস্যু লইয়াই ভারতের সাথে আমাদের বোঝাপড়ার বাস্তবিক ও ঐতিহাসিক কারণ তৈরী হয়ে আছে। এই মুহূর্তে ভারত ও তার আশে পাশের দেশগুলোতে, যেমন মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান সব জায়গার জনরাজনীতিতে ভারতপ্রশ্ন গুরু ও ডিসিসিভ ফ্যাক্টর আকারে হাজির আছে। বাংলাদেশেও গত ষোল বছরের একদলীয় শাসন এবং এই শাসনের প্রতি ভারতের শাসকদের ব্যক্তিগত বন্ধুত্বমূলক সম্পর্কের কারণে, এবং ছাত্র-জনঅভ্যুত্থান পরবর্তি নতুন বাংলাদেশ সরকারের প্রতি বৈরী আচরণের কারণেও ভারতপ্রশ্ন আবার নয়া কইরা রাষ্ট্রের এসেনশিয়াল ফেনোমেনন আকারে হাজির হইছে। যার মোকাবেলার কৌশলপত্র ও নীতিমালা ঠিক করতে হবে অভ্যুত্থানের সরকারকে। এই কৌশলপত্র সংবিধান না হোক, অভ্যুত্থানের বিপ্লবী দলিলের অন্তর্ভূক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশে ভারতপ্রশ্নটি বেশ জটিল। সাধারণত, রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক হয় রাষ্ট্রের। রাজনৈতিক দলের সাথে নয়। কিন্তু, ভারতের সাথে বাংলাদেশের কেবল একটা রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক, যা চরিত্রে ব্যক্তিগত, এমন কি নির্ভরতারও। এইটা অনৈতিক ও পরকিয়ার ঘটনার মত। চরিত্রগতভাবে, এইটারে আমি দুই শয়তানের ঘোটপাকানি বলি। এইখানে মোদি গাঁধি সবই এক। এই ঘোটপাকানির সমাধান কী? সমাধান না যদি করা হয়, বাংলাদেশের এই যে এমার্জিং ভারতপ্রশ্ন, যা ফ্যাসিস্টের সময়ে বয়কট ইন্ডিয়া আকারে দেখা দিয়েছিল, এখনো চলমান, ভারতের জন্য এইটারে মোকাবেলা কঠিন হবে।
আমার মতে, সমাধান হল, বাংলাদেশ এবং ভারত উভয়রেই নিজেদের স্বার্থগুলো নিয়া খুল্লমখোলা, পরিস্কার আলোচনা করতে পারতে হবে ও সুস্পষ্ট ঘোষণা দিতে পারতে হবে।
ভারতকে সুষ্পষ্ট ঘোষণা দিতে হবে অন্তত দুইটি বিষয়ে। এক. পার্বত্য চট্টগ্রামে সব ধরনের ইন্টারভেনশন বন্ধ রাখবে ও কোন রকম সশস্ত্র গ্রুপের সাথে সম্পর্ক রাখবে না। দুই. কোন অবস্থাতেই সীমান্তে গুলি চলবে না এবং তার নজির দেখাতে হবে। এরপরে, স্তরে স্তরে পানির নায্য হিস্যা, বাণিজ্য ঘাটতি, এইসব আলাপেও আন্তরিকতা দেখাতে হবে ভারতকে। এই ঘোষণাগুলো রাষ্ট্র হিশেবে বাংলাদেশের জনগনের মধ্যে কার্যক্ষেত্রে ভারতবৈরী যে মনোভাব, তা কমাবে। ফলত রাজনৈতিক দলগুলোও, যেমন বিএনপি জামাত, এমনকি ভারতপন্থি বইলা পরিচিতদের রাজনীতিও ভারতপক্ষ বা বিরোধিতার চাইতে আরো ডাইনামিক হবে। রাষ্ট্র হিশেবে ভারতও স্রেফ জনকনসেন্টহীন একটা দলমাত্রের অনৈতিক সমর্থক হিশেবে বিবেচিত হবে না বাংলাদেশের জনগনের কাছে। ভারত একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের উপরে নির্ভরতার চাইতে বেটার পলিটিক্যাল সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
একই সাথে, বাংলাদেশেরও রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি হতে হবে, তাদের ক্ষমতাকালে বাংলাদেশও ভারতের সশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর সাথে কোনরকম সম্পর্ক রাখবে না ও আশ্রয় দেবে না। যেটিরে শেখ হাসিনা, বেশ নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ততার সাথেই বলতে সক্ষম হইছিলেন, বাংলাদেশের মাটি ভারতের শত্রুদের ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। যারে আমরা স্রেফ ঘোটপাকানির বাইরে পড়তে পারি নাই তখন।
উভয়ের এই সুষ্পষ্ট সিদ্ধান্ত ও ঘোষণা ছাড়া, রাষ্ট্র হিশেবে ভারতের সাথে রাজনৈতিক দল হিশেবে আওযামীলীগের যে একাট্টা ও অনৈতিক ঘোটপাকানি, তারে মোকাবেলা করা যাবে না। আবার, ভারতেরও রাষ্ট্র হিশেবে মুক্তি হবে না। আর আমরাও ভারতীয় পণ্য বর্জন ইত্যাদি জনপ্রিয় শ্লোগানে মশগুল থাকব। ভারত কি এই সমাধানেই নির্বাণ চায়?
No comments yet. Be the first!