বাঙালি মুসলমানের স্বতন্ত্র রাষ্ট্রসাধনা যেমন আছে, আমাদের ভাষা ও নন্দনেরও স্বতন্ত্র লড়াই আছে একটা, আমি যেইটারে পুতুপুতু রবীন্দ্রভাষা ও নন্দন থিকা মুক্তি বলি। এইটা একাট্টা মুসলমানি চেহারার পাকিস্তান থিকা যেমন আলাদা, উপনিবেশিক ও বর্ণবাদী, কোলকাতার হিন্দু বাবুসংস্কৃতির থিকাও, ফার আলাদাই। এই নিয়া, গত বছর সেপ্টেম্বরের লেখা এইটা। পইড়েন। এই লেখায় আলাদা কইরা কারো নাম না নিলেও, এই লড়াইয়ের শেষভাগে, আমাদের অনেক বন্ধু আছেন, যেমন নাটক ও মুভিতে Mostofa Sarwar Farooki রে আমি খেয়াল করি। ফারুকীর নাম আলাদা কইরা নিলাম, কারণ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে সাপোর্ট ও জুলাই স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কারণে, ফারুকীরে নিয়া একটা সচেতন ডেমন তৈরী করা হইতেছে। আমাদের বন্ধুদেরকে ডেমন করার এই ঘটনাগুলোকে যে আমরা সচেতনভাবে লক্ষ্য রাখছি, তা নোট করারও ব্যাপার আছে।
~এলা পড়ুন~
পাকিস্তানের পরে, বা পাকিস্তান আন্দোলনের সময়ে ভাষার একটা নন্দন আন্দোলন হইছিল। সেই সময়ের শাহেদ আলীর ভাষা দেইখেন, উনারা এক নতুন কল্পবিশ্ব তৈরী করতেছিলেন, ভাষার। এই কল্পবিশ্বকে আমার প্রবলেমেটিক মনে হইত, অনেকটা হোসেন মিয়ার দ্বীপের মত, যেখানে কুবেরদের সংগ্রাম কম, কিন্তু কুবেররাও থাকেন। শাহেদ আলীর ভাষায়, যখন পড়েছিলাম, তখন এই সমস্যাটা ধরা পড়েছিল। যদিও বাংলা ভাষায় শাহেদ আলীর ছোটগল্পর মত শক্তিশালী কারো গল্প পড়েছি বইলা, আমার স্মৃতিতে মনে পড়ে না। এই জন্য শাহেদ আলী আমার অসম্ভব প্রিয়।
এর পরে, আমাদের ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ হল। এই ভাষা আন্দোলনও শাহেদ আলী আর তাদের তমদ্দুন মজলিশই করেছে, মনে রাখবেন। কিন্তু, একাত্তরে আইসা, মুক্তিযুদ্ধে উনাদের অনেকেই গরহাজির বা চুপ ছিলেন। কেন তারা চুপ, তাদের এই স্বপ্নভঙ্গ নিয়া তারেক মাসুদের মাটির ময়না নামে সিনেমা দেখবেন, আর রিফাত হাসানের লেখা, যারে ছাড়া এই ঘটনা বুঝতেই পারবেন না, তারেকের মৃত্যুর পরে বিডি আর্টসের অনুরোধে লিখছিলাম, গুগল কইরা পাবেন। 'রিফাত হাসান' লিইখা, বা 'মাটির ময়না ও তারেক মাসুদের লড়াই' লিইখা গুগল কইরেন, আর পইড়েন।
এরপরে, আমাদের গণমুক্তিযুদ্ধের পরের ভাষার চরিত্র আবার অন্যরকম। ভাষার 'প্রমিত'। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তি ভাষার এই যে 'প্রমিত', তা মূলত বাংলা ভাষার কলকাতা, দি ওয়েস্টল্যান্ড। একটা পুরোপুরি মরা দ্বীপ। আগেও ছিল, কিন্তু পরে আমরা অফিসিয়ালি ঢুকে পড়লাস, একটা ধর্মযুদ্ধ ঘোষণার মাধ্যমে। আমি যেইটারে মুজিবের তৈরী করে দেওয়া ধর্মযুদ্ধ বলি, এই ওয়েস্টল্যান্ড হল তার একটা অংশ। এইখানে শাহেদ আলীরা থাকলেন না। বাঙালি মুসলমান থাকলেন না। এমন কি ঢাকাও থাকল না। কেবল ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ, কলকাতা ও তার ধর্মভাব। এই কলকাতার মরা দ্বীপে ভাষার মুসলমান নিধন শুরু হল, যার বিরুদ্ধেই পাকিস্তান আন্দোলনের শাহেদ আলীদের নন্দন কল্পনা ছিল, যখন জিবরাঈলের ডানা লিখতেছিলেন।
তো, মুক্তিযুদ্ধের পরে আমাদেরে আবার ভাষার এই ওয়েস্টল্যান্ড থেকে মুক্তির সংগ্রাম করতে হল। নয়া নন্দনের লড়াই করতে হল নানান ভাবে। ভাঙচুর করতে হল নাটকে, সিনেমায়, সাহিত্যে। এই লড়াইয়ের মাধ্যমে, ভাষায়, বহু বছর ধইরা এই কলকাতার দশা থেকে উত্তরণের একটা ব্যাপার ঘটে গেছে ইতিহাসে, নানান ভাবে, যেমন, এখন আমরা কেউই এই ভাষায় কথা কই না, চিন্তাও করি না। এই ওয়েস্টল্যান্ড, পুরোপুরি ভেঙে গেছে জুলাইয়ের বহু আগেই। এরপরে যে জুলাই হল, দেখবেন, এই জুলাইয়ে কলকাতার নন্দন নেই। তাই জুলাই সম্ভব হল। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে, আমাদের এই যে নয়া নন্দনের লড়াই ও ভাবগুলো, তারে ধরতে পারেন?
No comments yet. Be the first!