পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন কেমন হচ্ছে? খুব যে খেয়াল করছি, এমন না। বুথফেরত জরিপ খুব ভাল খবর দিচ্ছে না, তবে, আগের বুথফেরত জরিপগুলোরে আমলে নিলে, একটা স্বস্তি পাওয়া যায়। আগে, এই জরিপ সব সময়ই ভুল প্রুভড হয়েছে।
বাংলাদেশি এবং মুসলমান হিশেবে, এই নির্বাচনে, আমার সবচেয়ে বেশি যে বিষয় নজরে পড়েছে, তা হল, এই নির্বাচনকে কেন্দ্র কইরা কিছু মানুষের ভোটাধিকার হরণের কথা বলা হচ্ছে, যাদের বড় অংশ মুসলমান। অভিযোগ আছে, রাজ্যের মুসলমান অধ্যুষিত দুটি জেলা – মালদা আর মুর্শিদাবাদে এই কাজে কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার হয়েছে। 'অ্যাডলফ হিটলারের আমলে নাৎসি জার্মানি যেভাবে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক তৈরি করেছিল, বা যেভাবে ইসরায়েলে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক তৈরি করার প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে ও হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচন এই রাজ্যসহ গোটা ভারতকে বিজেপি সেই দিকে নিয়ে যেতে চাইছে' বলে মনে করছেন, ভারতীয় অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী পারাকালা প্রভাকর। প্রভাকরের এই বক্তব্য নিলাম, প্রথম আলো পত্রিকা থেকে। তো, এই ব্যাপারটা আমার প্রথমে নজরে আনল, বিবিসি বাংলার মীর জাফরের বংশধরদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার নিউজ। মীর জাফরের সর্বশেষ বংশধর, যারে ওরা ছোটে নবাব বইলা থাকে, বিবিসিকে বলতেছিলেন, 'যদি ভোট দিতে না পারি, তাহলে এখানে থাকতে পারব না, আমাকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু আমি তো এই মাটিতে জন্ম নিয়েছি, এখানেই মাটি নেব। শুধু আমার সঙ্গে না, পরিবারের অনেকের সঙ্গেই হয়েছে এই অন্যায়।' পইড়া, আমি ভাবতেছিলাম, একটা দেশের নাগরিকদেরকে নিয়া সেই দেশের মৌলবাদী শাসক শ্রেণীর মনোভাব কেমন হইতে পারে। তো, আমার ফ্রেন্ডলিস্টের অত্রি ভট্টাচার্যরা নির্বাচন নিয়া কথা বলেন, প্রায়ই দেখি। অত্রি এবং তার বন্ধুদের আমার পছন্দ হয়। ওদের তর্কগুলোও। উনাদের মধ্যে 'মমতা' আছে, আরো অনেক অর্থেই। কিন্তু, এই নির্বাচনে মমতা ব্যানার্জি হারবেন, এরকম একটা শোর তোলা হইতেছে বিজেপির পক্ষ থেকে। ফলাফল কী হবে, আমি শিওর না।
তবে, বইলা রাখি, রাজনীতিবিদ হিশেবে মমতা ব্যনার্জিকে আমার বেশ পছন্দ হয়। মনে হয়, পাশে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ মানুষ বইসা আছেন। এই রাজ্য বিজেপির হাতে গেলে, খারাপ লাগবে। রাষ্ট্র ইন্ডিয়ার সাথে আমাদের এক নায্যতার লড়াইয়ের সম্পর্ক আছে, কিন্তু, ইন্ডিয়ার মানুষের প্রতি, তাদের কলকাতা ও অন্যান্য শহরগুলোর প্রতি ঐতিহাসিক টান অনুভব করি আমি। ভারতের নবী ও কবি রবীন্দ্রনাথের সাথেও, আমার ঐতিহাসিক প্রেম ও ঝগড়ার সম্পর্ক আছে। আপনারা খেয়াল কইরা থাকবেন, আমি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের একটা রবীন্দ্রগ্রহণ ও তার থেকে মুক্তির কথা বলি। তো, ইন্ডিয়ার রাষ্ট্র ক্ষমতা নিয়া আমার মতামত হল, এইখানকার মোদি গাঁধি সবাই বাংলাদেশ প্রশ্নে ঐতিহাসিকভাবে একই অবস্থানে দাঁড়ান ও সীমান্তে খুন করারে তাদের কর্তব্য মনে করেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের রাষ্ট্রীয় ডমিনেন্সি ও নিয়ন্ত্রণরে গুরুত্বপূর্ণ ভাবেন। সীমান্ত ও ফেলানি হত্যার বিরুদ্ধে তাদের অবস্থান নেই।
তো, দুই হাজার চোদ্দতে এই নিয়া একটা লেখা লিখেছিলাম, ঋষি ভারত। তখন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় এসেছিলেন বুকশপ বাতিঘরের আমন্ত্রণে। উনারে কেউ তখন ইন্ডিয়ার সীমান্ত হত্যা নিয়ে প্রশ্ন করলে, উনি তখন ঋষির ভাব নিয়া কইছিলেন, এইসব রাজরাজড়াদের আলাপ। আমরা কেন কথা কব? আরো পরে, টেক্সট, কন্সপিরেসি ও রূপকথা বহিতে, সম্ভবত আঠার সালের দিকে একটা আলাপ করেছিলাম, শিরোনাম ছিল, ক্যান অরুন্ধতি স্পিক? তখন অরুন্ধতি বাংলাদেশে আসছিলেন, ফটোগ্রাফার শহীদুল আলমের আমন্ত্রণে। আমি ধরিয়ে দিতেছিলাম, এই বড় বড় সাহিত্যিক ও বিপ্লবীদের কেউ ইন্ডিয়ার সীমান্ত হত্যা নিয়া কথা কন না, কারণ ওরা কথা কইতেই সক্ষম না। তবে, সব সময়ই, ব্যতিক্রম ছিলেন কলকাতার কবির সুমন, আমাদের কৈশোরের সকাল বিকেল যার গান মুগ্ধ হযে শুনতাম। সুমন সীমান্ত হত্যা নিয়ে কথা বলেছেন, গানও গেয়েছেন। এমন কি জুলাই পরবর্তি মিস-ইনফর্মেশন ছড়ানো নিয়াও তৎপর হলেন, আপনার নজরে পড়বে। এই তৎপরতার অংশ হিশেবেই, কবির সুমনদের সাথে, বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তি শান্তিসেতু নামক মৈত্রি উদ্যোগে অল্প অংশগ্রহণ করেছিলাম। এই নিয়া মধ্যবর্তি বেঞ্চটাতে বইয়েও ডিটেইল আলাপ করেছি, নোট দিলাম, যাতে আপনাদের আগ্রহ তৈরী হয়। মাসুম নামে সংগঠন ও কিরিটি রায়ের নাম মনে আছে, যারা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক নির্যাতন, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নারী পাচার এবং রাষ্ট্রীয় অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার। আর, আমাদের প্রবীন বন্ধু, কবি গৌতম চৌধুরীর কথা মনে আছে। উনিও, বাংলাদেশ ও ফেলানী প্রশ্নে প্রগ্রেসিভ অবস্থান নিতে পেরেছিলেন। আর একবার, বোধ হয় রণজিত দাশের সাথেও, শীর্ষেন্দুর মত একটা আলাপ হইছিল। এই নিয়াও, কী কী যেন লিখছিলাম, রণজিত কী বলেছিলে, তাও ভুলে গেছি।
তো, ভারত আমাদের সীমান্তে কেমন, তারে বোঝার জন্য, দুইহাজার পঁচিশ সালের একটা ঘটনা নজরে পড়ল। ভারতে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ২৪ বছর বয়সী কৃষক জাহানুর হককে জামা খুলে ধর্ম নিশ্চিত হওয়ার পরে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল বিএসএফ। প্যান্ট খুলে মানুষের ধর্ম যাচাই এর মত বর্বর, অসভ্য ঘটনা একাত্তরেও ভারত করেছে, ইন্ডিয়ান জার্নালিস্ট কিশোর পারেখের তোলা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের একটা বিখ্যাত ফটোগ্রাফ থেকে সেই ইতিহাস অনেকেরই জানা থাকার কথা। ২০২০ এর ফেব্রুয়ারিতেও, দেশটির হিন্দুস্তান টাইমস ও টাইমস অব ইন্ডিয়ার রিপোর্ট অনুযাযী, ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে দেশটির বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন বিরোধী বিক্ষোভের সময়, কর্তব্যরত সাংবাদিকদের প্যান্ট খুলে, ধর্মপরিচয় জেনে, তিনি সংবাদ সংগ্রহের ‘উপযুক্ত’ কিনা, সেই পরিচয় নিশ্চিত করছিল পুলিশ। আর, গতকালকে একই দেশের সীমান্তরক্ষি বাহিনী, একই ঘটনা করে খুন করল। একটি জাতি ও রাষ্ট্রের চরম সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল চরিত্র বোঝার জন্য ইতিহাসের সম্পূর্ণ দুই সময়ের এই দুই ইমেজই যথেষ্ট। আর ভারতের আওয়ামী প্রপাগান্ডা মেশিন এই ধর্ম যাচাই এর ইমেজরে পাকিস্তানী সৈন্যের ইমেজ বানিয়ে চল্লিশ বছর ধইরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদী প্রচারণা চালাইছিল, আপনাদের মনে থাকিত পারে।
তো, যখন প্রথম এনআরসি কার্যক্রম শুরু হল, তখন, ভারতের নিজের নাগরিকদের পরিচয় হরনের ঘটনা নিয়া আমার প্রাথমিক অনুভূতি ছিল, রাষ্ট্র হিশেবে ইন্ডিয়া কেমন অবিশ্বস্ত ও অপমানকর নিজের নাগরিকদের জন্য, ভাইবা আতঙ্ক লাগছে। বহু পুরুষ ধইরা এক দেশে থাকার পরে হঠাৎ একদিন ভোরে ঘুম থেকে উইঠা নিজেদের নাগরিত্বের প্রমাণ, আর কয়েক পুরুষের 'জন্ম মুত্যু সংশাপত্র' সংগ্রহের জন্য শরনার্থীদের মত লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে ইন্ডিয়ার লোকেদের। নাগরিক প্রমাণের জন্য অপমানজনক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, আর দেশের ভেতরে তৈরী হচ্ছে বড় বড় চিড়িয়াখানার মত কারাগার, যারা কাগজপত্র ঠিকঠাক দিতে পারবেন না, তাদের জন্য। শাসকশ্রেণী ও রাজনীতিবিদগণ সারাক্ষণ হাউকাউ কইরা হুমকি দিচ্ছেন, নাগরিকদের অন্য দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে অথবা কারাগারে ঢুকিয়ে দেওয়া হবে। নাগরিক থাকবে না এই আশঙ্কায় প্রতিদিন আত্মহনন করতে হচ্ছে নাগরিকদের। এই ধরণের চরম নাগরিক অপমানের বিরুদ্ধে যে জনগন দাঁড়ায় না, ফুঁসে ওঠে না, তাদেরে কেমন আত্মমর্যাদাশীল কই? এই মন্তব্য করেছিলাম, দুই হাজার উনিশের সেপ্টেম্বরে।
এখনো, ভারতের রাজনীতিতে, এই বাংলাদেশ ও নাগরিকত্ব হারানোর প্রশ্নটিই প্রধান টুল হিশেবে রয়ে গেল।
কারে কারে যেন, 'বাংলাদেশি' বইলা শুভেন্দু অধিকারীর নামের রাজনীতিবিদের দৌড়াদৌড়ির ভিডিও দেখলাম, ভোটের ভেতরেই।
বাংলায় কথা বলা, আর মুসলমান সবাইরে 'বাংলাদেশি' বইলা ইন্ডিয়ার ভেতরেই আদার করতে চাওয়া, এইটা 'ইন্ডিয়া' পরিচয়ের লুপহোল। এই বর্ণবাদী ইন্ডিয়ার প্রতি নিন্দা। সাম্প্রদায়িক, হিন্দুত্ববাদি ও বর্ণবাদি শাসকগোষ্ঠির বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি জনগোষ্ঠির প্রতি সংহতি জানাতে চাই, সব সময়। ইন্ডিয়ার জনগনের সাথে আমাদের মৈত্রীমূলক সম্পর্ক ও সহযোগিতার সেতু অটুট থাকবে সব সময়, সীমান্তবর্তি প্রতিবেশিদের প্রতি ইন্ডিয়ার শাসকগোষ্ঠির আধিপত্যমূলক বিদেশনীতি, খুন ও রাজনীতিরে প্রত্যাখ্যান কইরাই। এই নির্বাচন, এই আদারনেসের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শন করুক।
No comments yet. Be the first!