সংবিধানের যে 'সংস্কার' হয় না, রহিত, সংশোধন বা বাতিল মাত্র হয়, সালাহউদ্দিন আহমদ, গ্রামার ও আইনের কড়া ছাত্র হিশেবে এইখানে তেমন ভুল কিছু বলেন নাই। আমাদের আইন ও জুরিস্প্রুডেন্সের ধারণাগুলো, সর্বোচ্চ, মুখস্তচর্চা হিশেবে সামনে আসে, এই লিমিটের জায়গা থেকে, সালাহউদ্দিন আহমদের মুখস্ত অবস্থানকে আমি পড়তে পারি। তবে, মিস্টার আহমেদ সংবিধানের আর একটা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থা বলেন নাই, হয়তো ইচ্ছে করেই। সেটি হল, নয়া সংবিধান গ্রহণের মুহূর্ত। সেটি একটা রাষ্ট্রের দার্শনিক মুহূর্ত। উনি ভাবতে পারেন না হয়ত এই দুর্লভ মুহূর্তটারে। কারণ, এই দুর্লভ মুহূর্ত সব সময় আসে না। শবে কদরের মত, তারে আপনি খুঁজে নিতে পারবেন কেবল, বেজোড় রাতগুলোতে। জনকনসেন্ট ও অভ্যুত্থানের স্ফুরণের মুহূর্তগুলোতে। যে মুহূর্তে রাষ্ট্রে একসাথে থাকার বিষয়ে আমাদের সোশাল কন্ট্রাক্টগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করে। মানুষেরা সব ভুলে একত্রিত হয়। এই মুহূর্ত থিকাই নয়া সংবিধান গ্রহণের মোমেন্টাম তৈরী হয়।
উনিশ শ একাত্তর সালে আমাদের গণমুক্তিযুদ্ধ ছিল সেরকম একটা মুহূর্ত। জুলাই জন-অভ্যুত্থানও, এরকম একটা দার্শনিক মুহূর্ত, ফলে রাষ্ট্রে আপনার মালিকানা রিক্লেইম করার মুহূর্ত হাজির হয়েছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের পরপর, সেই সময় আমি তিনটা মূল পয়েন্ট আলোচনা করেছিলাম, একটি লেখায়। এক. জুলাই জনঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের উপরে জনগনের হারানো মালিকানা রিক্লেইম করার মুহূর্ত হাজির হয়েছে। এর উপায় হল, নতুন সংবিধান। দুই. বিদ্যমান সংবিধান ঐতিহাসিক স্বৈরাচারগুলো ও হাসিনার গুলির বিপরীতে জনগণের পক্ষে এথিকাল অথরিটি হয়ে দাঁড়াতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে, এথিকাল অথরিটি হারবয়েছে। ফলে, নতুন সংবিধান লাগবে। তিন. এই সংবিধান, নিজের রিজিড চরিত্রের কারণেই আর সংশোধনযোগ্য না। সংবিধান অনুযায়ীই, আপনি সংশোধনের চিন্তা করলেও মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ করবেন। ফলে, নতুন সংবিধান লাগবে। এই আলাপ নিয়ে আমি সেই সময় কিছু সেমিনার ও লেখা লিখেছিলাম, পরে, কিছু সংকলনে, এবং তারো আগে, বা পরে, মধ্যবর্তি বেঞ্চটাতে বহিতে মুদ্রিত হয়েছে।
তো, এই নতুন সংবিধান, স্বাভাবিকভাবেই, কোন নির্বাচিত সংসদের এখতিয়ার নয়। আবার, কোন নির্বাচিত সংসদ এই রিজিড সংবিধান সংশোধনেরও অধিকার রাখে না, এইটা সংবিধানই বলছে। এর এখতিয়ার, ঐতিহাসিকভাবে, একমাত্র কোন অভ্যুত্থানের সরকার, নির্বাচিত গণপরিষদ, বা গণভোট থিকা উঠে আসা পরিষদেরই থাকা সম্ভব। কিন্তু, সেই সময়, দেখা গেল, বড় দল বিএনপি নির্বাচিত সরকারের হাতে সংবিধান প্রশ্ন ছেড়ে দিতে চাইল, আর, আমার অত্যন্ত পছন্দের ব্যক্তি হাসনাত কাইয়ুমদের দল রাষ্ট্রসংস্কার আন্দোলন, যারা জন্মের পর থিকা নতুন সংবিধান লইয়া পাঠচক্র ও তৎপরতা ইত্যাদি করেছেন, তারাও, অভ্যুত্থানের পরপর বিএনপির জেশ্চারের সাথে মিলিয়ে কণ্ঠ ছোট করে কইতে লাগলেন, এখন নতুন সংবিধানের মোমেন্টাম নয়, উনাদের লাগবে, সংস্কার। হাহা, মানে, বিএনপির সেই সংবিধান সংস্কার পরিষদ, যেইটা তাদের একত্রিশ দফার অংশ ছিল। এই হল ইতিবৃত্ত।
তো, এই ইতিবৃত্তের পরের ঘটনা কী? সংবিধান সংস্কার পরিষদ তো অপরিচিত আইডিয়া, এই অপিরিচিত আইডিয়ার বৈধতা ও বাধ্যবাধকতা কই থিকা আসে? এরকম একটি কারণ দেখিয়েই, বিএনপি, এখন, গণভোট হয়ে যাবার পরে, নিজেদের দাবীকৃত এই সংস্কার পরিষদের বিরুদ্ধে দাঁড়াল, কোন রকম একসকিউজ ছাড়াই। আমি, মনে করি, এর বৈধতা ও বাধ্যবাধকতা, কোনটাই পরিচিত অপিরিচিত আইডিয়াতে না, বিএনপির একত্রিশ দফাতে, বা হাসনাত কাইয়ুমের ইনভেনশনে না। মূলত, গণভোটের রায়ে। এই সোর্স অব ট্রুথ লঙ্ঘন করতে, সালাহ উদ্দিন আহমদের, মূলত, আর একটি গণভোট লাগবে। বা, আর একটি কনস্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলির নির্বাচন লাগবে। এইখানে সালাহউদ্দিন আহমদের বাকপটুতায় মুগ্ধ হবার সুযোগ নেই তেমন কইরা। এর কোনটারে বাদ দিয়ে, বিএনপি যেভাবে আগাতে চায়, তা রাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য খারাপ ঘটনা হবে।