বিএনপি, এখন পর্যন্ত, হয় কনফিউজড দল, না হয়, সচেতনভাবেই হঠকারি কৌশলি হিশেবে নিজেদের সামনে আনছে, অনেকগুলো ইস্যুতেই। যেহেতু বিএনপির প্রতি এত দ্রুত আস্থা হারাতে চাই না, প্রথমটিই ধরে নিতে চাই এবং তাদের রাজনীতি পরিস্কার হোক, সেটি চাই। তারা আরো স্পষ্ট অবস্থান নিক, যে অবস্থানই নিক, এইটা জরুরি। যেমন, আজকেও মির্জা ফখরুল থেকে যখন আওয়ামীলীগের বিষয়ে জিগেশ করা হল, তখন বললেন, ‘এটা আমরা চাইনি এবং যেহেতু আইনগতভাবে বলা আছে যে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, সেভাবেই এটাকে দেখা হবে সব জায়গায়।’ এর আগে, মেজর হাফিজ কইতেছিলেন কোথাও, কাছাকাছি লেঙ্গুয়েইজ, গণভোট আমরা চাই নাই, কিন্তু বাধ্য হয়ে মেনে নিয়েছি। এরপরে, গণভোট হয়ে গেল, হাঁ বিপুল ভোটে জয়ী হল, কিন্তু গণভোটের এই ম্যান্ডেট নিয়াও তারা একটা কনফিউজিং অবস্থান নিল। শপথ নিল না, এর পরে কী হবে এখনো আম মানুষ, যারা গণভোটে অংশগ্রহণ করল, তাদের কাছে স্পষ্ট নয়। সম্ভবত, জুলাই অভ্যুত্থান বিষয়েও এরকম একটা অনিচ্ছুক দাস, মানে, মেনে নিতে হইছিল বইলা পক্ষ ও বিবৃতি তাদের রেডি থাকবে, দরকারি মুহূর্ত সামাল দেওয়ার জন্য। এইটা একটা রাজনৈতিক দলের জন্য খুবই খারাপ ঘটনা। জনগনের জায়গা থেকে, যারা বিএনপিরে ভোট দিল এবং দিল না, উভয়েই বিএনপির এই অবস্থারে নিয়া একটা রাজনৈতিক গন্তব্যে থির হতে পারবেন না, মোটামুটি প্রতারণা বোধ করবেন। এই প্রতারণাবোধের ব্যাপারটা খারাপ, যে কোন রাজনৈতিক দলের জন্যই। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, রাজনীতি স্রেফ ক্ষমতা দখল ও ধইরা রাখার ব্যবস্থাপনা না, রাজনীতি হল জনগনের কাছে আস্থা ও কনসেন্ট তৈরী, যা তারা অস্পষ্ট রাখছেন। এইটা বেশ খারাপ ঘটনাই।
বিএনপি আমাদের সংস্কৃতির সংকটকে বোঝার মত মেচিওরড না। জানুয়ারি ২০২৫ এ লিখছিলাম। পড়তে পারেন। প্রায় দুই বছর তো হল। কালারফুল ফারুকির পরে এখন বিএনপির সংস্কৃতিমন্ত্রী হলেন নিতাই রায় চৌধুরী, বিএনপির আর এক বিখ্যাত নেতা নিপুণ রায় চৌধুরী হলেন উনার কন্যা। উনার কিছু মন্তব্য ভাসছে। তো, এই সময়ে আইসা আরো ভাল কইরা পড়তে পারবেন, এই লেখা।
~
বিএনপির লোকেরা আম, সাধারণ মানুষ। যেমন, গ্রামগুলোতে ক্ষেত খামারের লোকজন, আর দিনমজুরও আছেন। জামাত করে লোকেরা অল্প বুদ্ধিজীবী ও এলিট। কিছু বইপত্তর, যেমন সিলেবাস পড়েন যেহেতু। উনারা মুসলমান সংস্কারবাদী। ফলে, তেমন মূর্খ, মানে অক্ষরজ্ঞানহীন পাবেন না। কিন্তু সংস্কৃতিহীন, সংস্কারবাদী হেতু।
আর, বিএনপির সমর্থকরা মুসলমানি সংস্কৃতি লালন করেন বটে, কিন্তু সংস্কৃতির সংকটকে বোঝার মত মেচিওরড না। ফলে, তাদের তেমন কইরা কোন চেহারা পাবেন না কোথাও। ফলে, উভয়ই ব্রাত্য এইখানে।
যেমন, প্রথমে জামাত শিবির ও পরের দিকে বিএনপি জামাত উভয় রাজনৈতিক দল ও তাদের কর্মী ও সমর্থক গোষ্ঠি যে পরিমাণ টার্গেটেড গুম খুন ও নির্যাতনের স্বীকার হইছে হাসিনার আমলে, এইসবরে নিয়া বহু কালবেলা কালপুরুষ হইতে পারত। কিন্তু কিছুই হবে না, বরং ভুলে যাওয়া হবে। কিছু পার্টিজান কাজ হয়তো হবে, তা আবার দলগুলোর সিলেবাসে পড়ানো হবে। চব্বিশের অভ্যুত্থানও যেহেতু এই দুই দলের দলছুটেরাই বেশি, দেখবেন, তাদের জন্য কোন গান আর কবিতা নেই তেমন কইরা সংস্কৃতিমহলে। কালচারাল হেজিমনিতে তারা ব্রাত্য রহিয়া যাবেন।
আর, বিএনপি বা জামাত উভয় দলের তর্কগুলোতেও, দেখবেন, এমন কি রাষ্ট্রই নেই। আর সব আছে। রাজনীতিতে তো কমন শত্রু দরকার। তো, আওয়ামী লীগ চলিয়া যাওয়ার পরে উনাদের কমন শত্রু যেহেতু অনুপস্থিত, উনাদের রাজনীতিও স্রেফ পুরনো আওয়ামী লীগ আর আওয়ামীলীগ খেলাতেই মগ্ন রহিল। যেমন, জামাতকে মোকাবেলায় আওয়ামীলীগের রেথরিকগুলো বিএনপি ব্যবহার শুরু করেছে, দেখবেন। আর জামাত, ইসলামী দল থেকে মোর মডারেট চেহারা দেখানোর চেষ্টা করছে হঠাৎ, যা আদৌ তারা নয়। তবে, তারা হয়ে উঠতে যদি পারে, এইটা ভাল হতে পারত।
তবে তাদের আরো সমস্যা আছে, যেমন একাত্তর প্রশ্ন। একাত্তরের পরে, তাদের রাজনীতিতে অবস্থান পরিবর্তনের থিসিস নেই। এইটা তাদের ভোগাবে, যখন সময় আরো যাবে, এবং ক্ষমতার চরিত্র পরিবর্তন হবে, তখন। তবে, বিএনপি যদি আওয়ামীলীগের রেথরিকগুলোতেই থিতু হয়, এইটা অন্য ঘটনা ঘটাবে। আওয়ামীলীগের অনুপস্থিতি এর সমর্থকদের মধ্যে যে ভেকুয়াম তৈরী করছে, তা পূরণ করবে কিছুটা। বিএনপি, মানে মির্জা ফখরুলের চেহারায় পুরনো আওয়ামীলীগ ফিরবে। তারা বিএনপিতেই আওয়ামীলীগরে খুঁজে পাবে।
তবে, রাজনীতিতে পুরনো বিএনপির অনুপস্থিতিটা, নয়া ভেকুয়াম তৈরী করবে। বিএনপির সেই পুরাতন ইসলামী মূল্যবোধ আর বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের খালি স্পেইসটা নতুন রাজনীতি যারা চাহেন, যেমন বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, তাদের জন্য সুখকর হবে। তারা উদারতার সাথে এইটারে কাছে টেনে নিতে পারবে। মানে, চব্বিশ বেশ ভাঙচুর করবে। স্রেফ আওয়ামীলীগে না। সবখানে।
'আওয়ামীলীগের নির্দোষ নেতাদের ক্ষতি হতে না দেওয়ার' ব্যাপারে মির্জা ফখরুলের আলাপ ভালই, যদিও এখন ফখরুলের এই ভাষারে ভোট টানার আগ্রহ হিশেবেই পড়ছি। আমার মতে, এই অবস্থান সবার হওয়া দরকার ও প্রকাশ্য, স্পষ্ট হওয়া জরুরি। পুরনো আওয়ামী সমর্থকদের ভোটও সবার টানতে চেষ্টা করা দরকার, এই প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে। কারণ, গতকাল হাসিনাপুত্রও বলেছেন, হাসিনা আর ফিরবে না। তাদের কোন ক্ষতি হতে না দেবার ব্যাপারে, ভোটের ব্যাপার কেটে গেলে, বা এখনই বিএনপি, জামাত, এনসিপি সবার কনসেনসাস ঘোষণা করা দরকার। যে জুলুম আওয়ামীলীগ অন্যদের উপরে করেছিল, সেই জুলম যে অন্যরা আওয়ামীলীগের উপরও করতে চায় না, মানে একটা চিরস্থায়ী শত্রু ও রিভেঞ্জ ব্যবস্থা থিকা বেরুনোর ঘোষণা, এটাই তাদের গন্তব্য, এইটুক ঘোষণা তো জরুরিই।
বিএনপির শীর্ষ দুই নেতা, মির্জা ফখরুল ও নজরুল ইসলাম যে গণভোটে হাঁ এর কথা বললেন, এইটারে তো ওয়েলকাম জানাইলাম। কিন্তু, বিএনপির ছোট ছোট একটিভিস্ট ও বুদ্ধিজীবী দাবীদারদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ যে গণভোটে হ্যাঁ শুনলে, বা সরকারের হাঁ প্রচারণায় অস্থির হয়ে উঠছেন, এইটারে আমরা কীভাবে পড়বো? বিএনপির অন্য কোন সিদ্ধান্ত, এমন কি পথেঘাটের চান্দাবাজির সিন্ডিক্যাট নিয়াও তাদের এমন অসন্তুষ্টি ও অনাস্থা দেখা যায় না, বরং লড়াই করেই তার পক্ষে থাকতে চান। এই কারণে, আমি একদা কইছিলাম, বিএনপিরে কারা পরামর্শ দেয়, আল্লাহ মালুম। সবাই তো স্রেফ হাইকমান্ডের পরামর্শ নেয়, দেখি। আমার পোস্টে তাদের একটিভিস্ট দাবীদাররা কইতেছেন দেখলাম, স্বয়ং তারেক রহমান নির্দেশ দিলেও আমরা না এর পক্ষে থাকব, ভোট তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত। হা হা। তো, হঠাৎ এদের এই স্বাধীন সিদ্ধান্ত কই থিকা আসে? কোন গুপ্ত কৌশলের ব্যাপার কি? গণভোট নিয়া তো মফস্বল ও গ্রামে মানুষের সচেতনতা কম। তারা চিনবে প্রতীক, যেমন ধানের শীষ, বা দাঁড়িপাল্লা, বা অধুনা শাপলাকলি। এর বাইরে যে একটা ভোট হইতেছে, এইটারে নিয়া তারা ভাল কোন ধারণা পাইতেছেন মনে হয় না। এই অবস্থারই সুযোগ নিচ্ছে এই গুপ্ত কৌশল বা না ভোট এর প্রচারকারীগণ। যদি দলীয় সিদ্ধান্ত হাঁ এর পক্ষে হয়, এই 'না' এর প্রচারকারীদের ব্যাপারেও দলীয় সিদ্ধান্ত আসার কথা। আসবে কি?
আমি ফর্ম হিসেবে আবৃত্তি অপছন্দ করার লোক। কবিতা এইসব ভান দিয়া পাঠের জিনিশ না। একাধিকবার আমি খেয়াল করেছি, কবিরাও কবিতা পড়েন, ভান দিয়ে, পারফর্মার হিশেবে। কবিদের কবিতাপাঠে আমার আল মাহমুদ পছন্দ। মাহমুদ জীবিতকালে শহর নামে একটা কবিতা পড়ছেন, ইউটিউবে দেখা যায়। এইটা খুঁজে নিয়ে শুনবেন। আরো কিছু কবিতা, যেমন, প্রত্যাবর্তনের লজ্জা, শেষ ট্রেন ধরবো বলে এক রকম ছুটতে ছুটতে ষ্টেশনে- শুনবেন মাহমুদের কণ্ঠে। শুনলে, আপনি বুঝবেন, কবিতা ব্যাপারটা ঠিক কীভাবে পড়েন কবিরা, পারফরমেন্সরে থোড়াই পাত্তা দিয়ে। তো, গতকাল সাংবাদিক এহসান মাহমুদের শেয়ার করা একটা কবিতা পাঠ শুনলাম, আল মাহমুদের। নাম, খালেদা। শুনতে শুনতে আমার প্রথমে ভ্রম হইতেছিল, সেই একটু আগের শোনা আল মাহমুদই পড়তেছেন। দেখলাম, পড়ছেন ভদ্রলোকের নাম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। জুলাইয়ের আগের বছরগুলোতে মির্জা ফখরুলের নেতৃত্বে সারা দেশে যে জনসভা হইতেছিল, এগুলোরে আমি মানুষের এজতেমা কইতাম। সেই সময় ফখরুলরে বেশ পছন্দ হইত। প্রশ্ন করেছিলাম, বিএনপির এই এজতেমা কই গিয়া শেষ হবে? এখন আমরা কিছুটা পড়তে পারছি বিএনপিরে। সেই কারণে, জুলাইয়ের পরে এই পছন্দ আমার কমেছে নানানভাবে। কিন্তু, গতকাল সেই ফখরুলের এই কবিতা পাঠ শুনে, উনারে আবার, একটু ভাল লাগল। এই ভাল লাগা, কিছুটা অরাজনৈতিক। ফখরুল কোন ভান ও আবৃত্তিপনার ধার দিয়া যান নাই। স্রেফ পইড়া গেছেন। এইটুক আমার পছন্দ হল। যদিও, এই কবিতা যারা শেয়ার দিতেছেন, তারা কইতেছেন 'আবৃত্তি'। হা হা। তো, ট্রেডিশনাল আবৃত্তি করেন এমন একজন, মানে প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টর অইখানে গিয়ে কইতেছেন, আবৃত্তির কিছুই হয় নাই ওখানে। ফখরুল প্রায় কিছুই জানেন না, ইত্যাদি। হা হা। তো, এই হল প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টর, আর কবিতার পার্থক্য। ফখরুল, একজন কবি না হয়েও, কবিতারে প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টারদের থিকা আলাদা কইরা পড়তে ডরান নাই, এইটুক ভাল লাগল। বলতে পারেন, মুগ্ধ হলাম।
বিএনপি যে 'কোরআন ও সুন্নাহর' বাইরে কোনো আইন করবে না, ইসলামী পোশাক পইরা, আলেমদের সামনে মির্জা ফখরুলের এই অবস্থান ঘোষণা পছন্দ হইছে। বক্তৃতা শুনি নাই, পত্রিকার ফটোকার্ড আর ছবি দেইখা এই কমেন্ট। এইটা বেশ পলিটিক্যাল মুভ। একদা আওয়ামীলীগ সম্পাদক আবদুল জলিল যখন এই ঘোষণা দিয়া একটা চুক্তি করছিলেন আলেমদের সাথে, তাও পলিটিক্যালি ভেরি গুড মুভ ছিল। তখনও পছন্দ হইছিল। যদ্দুর মনে পড়ে, আবদুল জলিলের তখন টুপি পরতে হয় নাই, মানে, চেহারা বদলাতে হয় নাই। আমার মেমোরি ভুল হতে পারে। হাওএভার, এই ইস্যু নিয়া যে বাংলাদেশের 'ফার লেফট' মহল হাসিখুশি স্কুল বালকের মতই পুরোপুরি চুপ, পছন্দ হইছে এই ব্যাপারটাও। উনারা পলিটিকাল হইতে শুরু করেছেন। আশা করছি, জামাতের ব্যাপারেও, এনসিপির ব্যাপারেও তারা চুপ ও খুশি থাকতে শিখবেন।
আনসোশালে অল্প লিখেছিলাম। এখানে আবার উসকে দিই। গণভোট আর জুলাই সনদ নিয়া।
গণভোটের চার দফা, আর জাতীয় নির্বাচনের দিন একই সাথে গণভোট, উভয়ই কিম্ভূত আইডিয়া বলতে হবে। এই আইডিয়ার রূপকাররা জাতীয় নির্বাচন আর গণভোটরে এক ভাইবা বসেছেন, বা আমাদেরকে এক ভাববার প্রস্তাব করছেন। আমার মতে, জাতীয় নির্বাচন এক্সক্লুসিভলি নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারের ব্যাপার হলেও, গণভোট সুপেরিয়র রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন। একই দিনে নির্বাচন এবং গণভোট ফলত একটা ফাঁদে রূপান্তরিত হতে পারে, যা অবশেষে এক রশিতে দুই ফাঁসির প্রতীকী ধারণারে উসকে দেবে। এইখানে একই সকথে উভয়ের মৃত্যু হতে পারে।
আমার মত হল, ইউনুস এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পারলে ভাল। অলরেডি নির্বাচন কমিশন বলেছে, একই দিনে জাতীয় নির্বাচন এবং গণভোট চ্যালেঞ্জিং। এই একই দিনে দুই নির্বাচনের ধারণা কোন মেধাবীর ( কোটা না মেধা? হা হা।) মাথা থেকে আসছে জানি না, কিন্তু যে মহামুনিই ভাবুন, নির্বাচন কমিশনের এই কমেন্টরেও অন্তত উনারা আমলে নিতে পারেন, আমাদের কথা না নিন।
দুইটা বিষয়ে স্পষ্ট থাকা দরকার।
এক. গণভোট রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। দেশ কারা পরিচালনা করবে, সেই শাসন ক্ষমতার ম্যান্ডেট ধরনের কোন কল্পনা নয় এইটা, সালাহউদ্দিন আহমদরা মিষ্টি মধুর স্বরে যেটি বলে থাকেন প্রায়ই। বরং গণভোটের গন্তব্য হল, যারাই দেশ চালানোর জন্য নির্বাচিত হবেন, তারা কীভাবে চালাতে বাধ্য থাকিবেন, লঙ্ঘন না করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবেন, তারে লইয়া ভাবা। এমন কি সংবিধান কেমন হবে, তারে লইয়াও। ফলে, নির্বাচন হল মাইনা চলার ব্যাপার, আর গণভোট ডিকটেইট করার ব্যাপার। এইটা স্বয়ং নির্বাচিতদের প্রতি যে মেন্ডেট কল্পনা করা হয়, সেই মেন্ডেটেরও লেজিটিমেসির প্রশ্ন ঠিকঠাক করবে।
এইটুক যদি বুঝেন, তাহলে এইটাও বুঝবেন, এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তরে নির্বাচন কমিশনের ফাঁদে রাইখা সামনে আগানো মানে, গণভোট, সাথে জুলাই সনদেরও একটা অনিশ্চিত গন্তব্য ঠিক কইরা দেওয়ার ফন্দি, যা, আপাত একটা বিপদই। এর আঁচ কিছুটা বুঝবেন, যখন দেখবেন, বুদ্ধিজীবীরা এবং পত্রিকাগুলো এখন প্রচুর আলাপ তৈরী করছে, না ভোট জয়ী হলে কী হবে ইত্যাদি। এই আলাপগুলোর সারাংশ হল, না ভোট হইলে বিএনপি বা অন্য কোন দল জুলাই সনদ থিকা স্বাধীন হইয়া যাবে।
হা হা। এইটা একটা মজার প্রেডিকশন বটে।
এই নিয়া প্রথম আলোর এক্সপ্লেইনার পড়লাম। ফাহাম আব্দুস সালামের লেখা পাঠালেন এক বন্ধু। জিয়া হাসানের লেখা পাঠালেন একজন। সবার এক্সপ্লেইনার এক। 'না’ ভোট জয়ী হলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী দল জুলাই সনদ মেনে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না। পরবর্তী সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ইচ্ছার ওপরই সংস্কার নির্ভর করবে। মানে, সবাই একটা কু নিয়া বইসা আছে। এই কু এর পেছনে কে থাকবে, তাও ঠিক হয়ে গেছে মোটামুটি। বিএনপি নেতা জয়নাল আবেদিন ফারুক বিহানবেলাতেই সব ঠিকঠাক কইরা ঘোষণা দিছেন। উনি সমর্থকদের না ভোটের আহবান জানাইছেন।
আপাতত, এহ ইতিবৃত্ত।
এই ইতিবৃত্তের উপসংহার হল, নির্বাচনে জিততে চাওয়া দলগুলো ও ওদের বুদ্ধিজীবীরা এই কু-এর উপরেই সওয়ার হইতে চান। এই কু-ভাবনাটা তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন ইউনুস সাহেব, গণভোট এবং নির্বাচন একই দিনে ঘোষনা কইরা। এই সওয়ারের মতলবগুলোতে যেমন ইচ্ছা বাপের দেশের শাসনের বিরুদ্ধে যে জনকনসেনসাস এর উপরে ভিত্তি কইরা স্বৈরাচারের পতন হল, তার উপরে দাঁড়াবার কোন আগ্রহ নেই। শুধু ক্ষমতা দখলের বদ মতলব আছে। কিন্তু তাদের এই ভাবনা যে ভুল, তারে নিয়া আলাপ করবো আর একদিন, যদি সুযোগ হয়।
দ্বিতীয়ত, গণভোটের চার দফা, এইটা কেমন আইডিয়া? এইটা, আমার মতে, মূলতই গণভোটকে ব্যর্থ করার আইডিয়া। এজনগণ কর্তৃক একটা সফল গণঅভ্যুত্থান ও স্বৈরাচারের পতনের পরে জনগনের হাতে বাচ্চাদের বাল্যশিক্ষা ধরিয়ে দেওয়ার মত ব্যাপার হল এইটা।
মূলত, গণভোট হতে হবে এক দফায়। আর তার নাম জুলাই সনদ। জুলাই সনদে কী আছে, তা তো ঐতিহাসিকভাবে রিজলভড হয়ে আছেই। তারে আবার গণভোটের ব্যালটে ভেঙে বুঝিয়ে দেওয়ার মানে হল, মানুষ যেটি বুঝে, গণভোট মানে যেমন ইচ্ছা বাপ বেটির শাসন আর চলবে না, এইটার যে পতন হল, তার পক্ষে ভোট, এইটারে হুদাই জটিল হিশেবে উপস্থাপন।
এর ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে অলরেডি। বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জনগণকে জিগেশ করছেন, আপনারা কি গণভোট, সনদ এসব বোঝেন? হা হা। জনগণ যে এই ভাষায় এই সব বোঝেন না, তা অবশ্য সত্যিই। কিন্তু জনগন যে ভাষায় বুঝেন, কথা বলেন, মির্জা ফখরুল কি সেই ভাষা হাজির করতে চান, নাকি জনইচ্ছেরেই ব্যর্থ করতে বলেন? ফখরুল প্রমুখ রাজনৈতিক নেতারা এই সত্য এমনভাবে বলছেন, আপনার মনে হবে, এই না বুঝার ঘটনার কারণেই অন্তত গণভোট আর জুলাই সনদ বন্ধ করতে হবে।
ফখরুল তাদেরকে বুঝাচ্ছেন, 'ঘাড়ের ওপর' তাদের না বুঝা 'গণভোট ও সনদ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে'। মির্জা ফখরুল প্রবীণ ও সৌম্য বিএনপি নেতা, নিশ্চয় জ্ঞানীও, উনাদেরে এই প্রশ্ন করা দরকার যে, উনারা কি ফ্যাসিবাদের দিনগুলোতে 'গণঅভ্যুত্থান' বুঝতেন? বুঝাবুঝির প্রশ্ন তোলা তো কিছুটা অভব্যতাই। কিন্তু আমার এই প্রশ্ন ব্যক্তিগত বুঝাবুঝির ব্যাপার না, রাজনৈতিক। হাসিনার দিনগুলোতে উনারা যে গণঅভ্যুত্থান বুঝতেন, আমাদের কাছে তার কোন নজির হাজির নেই এখনো। এই জায়গা থেকেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই সরলোক্তিটা গুরুত্বপূর্ণ। এই সরলোক্তি বলে, এই অবুঝ ও অনিচ্ছুক নেতাদের উপরে গণঅভ্যুত্থানও চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এইটা জুলুম ছিল।
উনারাও কি মনে করেন, জুলুম ছিল?
#রিফাতহাসান
/ একই সাথে #ফেসবুকেও প্রকাশিত।
আনসোশালে অল্প লিখেছিলাম। এখানে আবার উসকে দিই। গণভোট আর জুলাই সনদ নিয়া।
গণভোটের চার দফা, আর জাতীয় নির্বাচনের দিন একই সাথে গণভোট, উভয়ই কিম্ভূত আইডিয়া বলতে হবে। এই আইডিয়ার রূপকাররা জাতীয় নির্বাচন আর গণভোটরে এক ভাইবা বসেছেন, বা আমাদেরকে এক ভাববার প্রস্তাব করছেন। আমার মতে, জাতীয় নির্বাচন এক্সক্লুসিভলি নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারের ব্যাপার হলেও, গণভোট সুপেরিয়র রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন। একই দিনে নির্বাচন এবং গণভোট ফলত একটা ফাঁদে রূপান্তরিত হতে পারে, যা অবশেষে এক রশিতে দুই ফাঁসির প্রতীকী ধারণারে উসকে দেবে। এইখানে একই সকথে উভয়ের মৃত্যু হতে পারে।
আমার মত হল, ইউনুস এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে পারলে ভাল। অলরেডি নির্বাচন কমিশন বলেছে, একই দিনে জাতীয় নির্বাচন এবং গণভোট চ্যালেঞ্জিং। এই একই দিনে দুই নির্বাচনের ধারণা কোন মেধাবীর ( কোটা না মেধা? হা হা।) মাথা থেকে আসছে জানি না, কিন্তু যে মহামুনিই ভাবুন, নির্বাচন কমিশনের এই কমেন্টরেও অন্তত উনারা আমলে নিতে পারেন, আমাদের কথা না নিন।
দুইটা বিষয়ে স্পষ্ট থাকা দরকার।
এক. গণভোট রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। দেশ কারা পরিচালনা করবে, সেই শাসন ক্ষমতার ম্যান্ডেট ধরনের কোন কল্পনা নয় এইটা, সালাহউদ্দিন আহমদরা মিষ্টি মধুর স্বরে যেটি বলে থাকেন প্রায়ই। বরং গণভোটের গন্তব্য হল, যারাই দেশ চালানোর জন্য নির্বাচিত হবেন, তারা কীভাবে চালাতে বাধ্য থাকিবেন, লঙ্ঘন না করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবেন, তারে লইয়া ভাবা। এমন কি সংবিধান কেমন হবে, তারে লইয়াও। ফলে, নির্বাচন হল মাইনা চলার ব্যাপার, আর গণভোট ডিকটেইট করার ব্যাপার। এইটা স্বয়ং নির্বাচিতদের প্রতি যে মেন্ডেট কল্পনা করা হয়, সেই মেন্ডেটেরও লেজিটিমেসির প্রশ্ন ঠিকঠাক করবে।
এইটুক যদি বুঝেন, তাহলে এইটাও বুঝবেন, এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তরে নির্বাচন কমিশনের ফাঁদে রাইখা সামনে আগানো মানে, গণভোট, সাথে জুলাই সনদেরও একটা অনিশ্চিত গন্তব্য ঠিক কইরা দেওয়ার ফন্দি, যা, আপাত একটা বিপদই। এর আঁচ কিছুটা বুঝবেন, যখন দেখবেন, বুদ্ধিজীবীরা এবং পত্রিকাগুলো এখন প্রচুর আলাপ তৈরী করছে, না ভোট জয়ী হলে কী হবে ইত্যাদি। এই আলাপগুলোর সারাংশ হল, না ভোট হইলে বিএনপি বা অন্য কোন দল জুলাই সনদ থিকা স্বাধীন হইয়া যাবে।
হা হা। এইটা একটা মজার প্রেডিকশন বটে।
এই নিয়া প্রথম আলোর এক্সপ্লেইনার পড়লাম। ফাহাম আব্দুস সালামের লেখা পাঠালেন এক বন্ধু। জিয়া হাসানের লেখা পাঠালেন একজন। সবার এক্সপ্লেইনার এক। 'না’ ভোট জয়ী হলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী দল জুলাই সনদ মেনে সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে না। পরবর্তী সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ইচ্ছার ওপরই সংস্কার নির্ভর করবে। মানে, সবাই একটা কু নিয়া বইসা আছে। এই কু এর পেছনে কে থাকবে, তাও ঠিক হয়ে গেছে মোটামুটি। বিএনপি নেতা জয়নাল আবেদিন ফারুক বিহানবেলাতেই সব ঠিকঠাক কইরা ঘোষণা দিছেন। উনি সমর্থকদের না ভোটের আহবান জানাইছেন।
আপাতত, এহ ইতিবৃত্ত।
এই ইতিবৃত্তের উপসংহার হল, নির্বাচনে জিততে চাওয়া দলগুলো ও ওদের বুদ্ধিজীবীরা এই কু-এর উপরেই সওয়ার হইতে চান। এই কু-ভাবনাটা তাদের হাতে তুলে দিয়েছেন ইউনুস সাহেব, গণভোট এবং নির্বাচন একই দিনে ঘোষনা কইরা। এই সওয়ারের মতলবগুলোতে যেমন ইচ্ছা বাপের দেশের শাসনের বিরুদ্ধে যে জনকনসেনসাস এর উপরে ভিত্তি কইরা স্বৈরাচারের পতন হল, তার উপরে দাঁড়াবার কোন আগ্রহ নেই। শুধু ক্ষমতা দখলের বদ মতলব আছে। কিন্তু তাদের এই ভাবনা যে ভুল, তারে নিয়া আলাপ করবো আর একদিন, যদি সুযোগ হয়।
দ্বিতীয়ত, গণভোটের চার দফা, এইটা কেমন আইডিয়া? এইটা, আমার মতে, মূলতই গণভোটকে ব্যর্থ করার আইডিয়া। এজনগণ কর্তৃক একটা সফল গণঅভ্যুত্থান ও স্বৈরাচারের পতনের পরে জনগনের হাতে বাচ্চাদের বাল্যশিক্ষা ধরিয়ে দেওয়ার মত ব্যাপার হল এইটা।
মূলত, গণভোট হতে হবে এক দফায়। আর তার নাম জুলাই সনদ। জুলাই সনদে কী আছে, তা তো ঐতিহাসিকভাবে রিজলভড হয়ে আছেই। তারে আবার গণভোটের ব্যালটে ভেঙে বুঝিয়ে দেওয়ার মানে হল, মানুষ যেটি বুঝে, গণভোট মানে যেমন ইচ্ছা বাপ বেটির শাসন আর চলবে না, এইটার যে পতন হল, তার পক্ষে ভোট, এইটারে হুদাই জটিল হিশেবে উপস্থাপন।
এর ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে অলরেডি। বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জনগণকে জিগেশ করছেন, আপনারা কি গণভোট, সনদ এসব বোঝেন? হা হা। জনগণ যে এই ভাষায় এই সব বোঝেন না, তা অবশ্য সত্যিই। কিন্তু জনগন যে ভাষায় বুঝেন, কথা বলেন, মির্জা ফখরুল কি সেই ভাষা হাজির করতে চান, নাকি জনইচ্ছেরেই ব্যর্থ করতে বলেন? ফখরুল প্রমুখ রাজনৈতিক নেতারা এই সত্য এমনভাবে বলছেন, আপনার মনে হবে, এই না বুঝার ঘটনার কারণেই অন্তত গণভোট আর জুলাই সনদ বন্ধ করতে হবে।
ফখরুল তাদেরকে বুঝাচ্ছেন, 'ঘাড়ের ওপর' তাদের না বুঝা 'গণভোট ও সনদ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে'। মির্জা ফখরুল প্রবীণ ও সৌম্য বিএনপি নেতা, নিশ্চয় জ্ঞানীও, উনাদেরে এই প্রশ্ন করা দরকার যে, উনারা কি ফ্যাসিবাদের দিনগুলোতে 'গণঅভ্যুত্থান' বুঝতেন? বুঝাবুঝির প্রশ্ন তোলা তো কিছুটা অভব্যতাই। কিন্তু আমার এই প্রশ্ন ব্যক্তিগত বুঝাবুঝির ব্যাপার না, রাজনৈতিক। হাসিনার দিনগুলোতে উনারা যে গণঅভ্যুত্থান বুঝতেন, আমাদের কাছে তার কোন নজির হাজির নেই এখনো। এই জায়গা থেকেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই সরলোক্তিটা গুরুত্বপূর্ণ। এই সরলোক্তি বলে, এই অবুঝ ও অনিচ্ছুক নেতাদের উপরে গণঅভ্যুত্থানও চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এইটা জুলুম ছিল।
উনারাও কি মনে করেন, জুলুম ছিল?
/ একই সাথে প্রকাশিত।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জনগণকে জিগেশ করছেন, আপনারা কি গণভোট, সনদ এসব বোঝেন? হা হা। জনগণ যে এইসব বোঝেন না, তা অবশ্য সত্যিই। ফলে, ফখরুল তাদেরকে বুঝাচ্ছেন, ঘাড়ের ওপর তাদের না বুঝা গণভোট ও সনদ চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। মির্জা ফখরুল প্রবীণ ও সৌম্য বিএনপি নেতা, নিশ্চয় জ্ঞানীও, উনাদেরে এই প্রশ্ন করা দরকার যে, উনারা কি ফ্যাসিবাদের দিনগুলোতে 'গণঅভ্যুত্থান' বুঝতেন? বুঝাবুঝির প্রশ্ন তোলা তো কিছুটা অভব্যতাই। কিন্তু আমার এই প্রশ্ন ব্যক্তিগত বুঝাবুঝির ব্যাপার না, রাজনৈতিক। ফ্যাসিবাদের দিনগুলোতে উনারা যে গণঅভ্যুত্থান বুঝতেন, আমাদের কাছে তার কোন নজির হাজির নেই এখনো। এই জায়গা থেকেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই সরলোক্তিটা গুরুত্বপূর্ণ। এই সরলোক্তি বলে, এই অবুঝ ও অনিচ্ছুক নেতাদের উপরে গণঅভ্যুত্থানও চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এইটা জুলুম ছিল।
চার. ভারত প্রশ্ন
[ সাম্প্রতিক দিনগুলোতে, দেখা যাচ্ছে, বিএনপি, জামাত, এনসিপি তিন গ্রুপই ভারত প্রশ্ন নিয়া আলাপে আগ্রহ দেখিয়েছে। মির্জা ফখরুল 'এই সময়' নামে মিডিয়ায়, ডাক্তার তাহের কোন এক ভারতীয় অধ্যাপকের সাথে, আর নাহিদ, তাও, 'দ্য উইক' নামে কোন এক ভারতীয় মিডিয়ার সাথে। এই সময়ে আইসা, আসেন, পুনপাঠ করি, এদের কার ভারত প্রশ্নটি কেমন, ভারত প্রশ্ন নিয়া আমাদের নিজেদের আগ্রহের জায়গা থেকে। নিচের লেখাটি গণঅভ্যুত্থানের পরপর আগস্টে লেখা 'আফটার ফ্যাসিস্ট পলিটিকাল মেনিফেস্টো' নামের লেখায় আমাদের অভ্যুত্থান পরবর্তি রাজনৈতিক ইশতেহার কেমন হওয়া দরকার, তার আলাপ এর অংশ। পুরো লেখাটির লিঙ্ক কমেস্টে দিচ্ছি। ]
ভারত আমাদের সীমান্ত। বাণিজ্য থেকে শুরু করে পানি, সীমান্তহত্যা, সব ইস্যু লইয়াই ভারতের সাথে আমাদের বোঝাপড়ার বাস্তবিক ও ঐতিহাসিক কারণ তৈরী হয়ে আছে। এই মুহূর্তে ভারত ও তার আশে পাশের দেশগুলোতে, যেমন মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান সব জায়গার জনরাজনীতিতে ভারতপ্রশ্ন গুরু ও ডিসিসিভ ফ্যাক্টর আকারে হাজির আছে। বাংলাদেশেও গত ষোল বছরের একদলীয় শাসন এবং এই শাসনের প্রতি ভারতের শাসকদের ব্যক্তিগত বন্ধুত্বমূলক সম্পর্কের কারণে, এবং ছাত্র-জনঅভ্যুত্থান পরবর্তি নতুন বাংলাদেশ সরকারের প্রতি বৈরী আচরণের কারণেও ভারতপ্রশ্ন আবার নয়া কইরা রাষ্ট্রের এসেনশিয়াল ফেনোমেনন আকারে হাজির হইছে। যার মোকাবেলার কৌশলপত্র ও নীতিমালা ঠিক করতে হবে অভ্যুত্থানের সরকারকে। এই কৌশলপত্র সংবিধান না হোক, অভ্যুত্থানের বিপ্লবী দলিলের অন্তর্ভূক্ত করতে হবে।
বাংলাদেশে ভারতপ্রশ্নটি বেশ জটিল। সাধারণত, রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক হয় রাষ্ট্রের। রাজনৈতিক দলের সাথে নয়। কিন্তু, ভারতের সাথে বাংলাদেশের কেবল একটা রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক, যা চরিত্রে ব্যক্তিগত, এমন কি নির্ভরতারও। এইটা অনৈতিক ও পরকিয়ার ঘটনার মত। চরিত্রগতভাবে, এইটারে আমি দুই শয়তানের ঘোটপাকানি বলি। এইখানে মোদি গাঁধি সবই এক। এই ঘোটপাকানির সমাধান কী? সমাধান না যদি করা হয়, বাংলাদেশের এই যে এমার্জিং ভারতপ্রশ্ন, যা ফ্যাসিস্টের সময়ে বয়কট ইন্ডিয়া আকারে দেখা দিয়েছিল, এখনো চলমান, ভারতের জন্য এইটারে মোকাবেলা কঠিন হবে।
আমার মতে, সমাধান হল, বাংলাদেশ এবং ভারত উভয়রেই নিজেদের স্বার্থগুলো নিয়া খুল্লমখোলা, পরিস্কার আলোচনা করতে পারতে হবে ও সুস্পষ্ট ঘোষণা দিতে পারতে হবে।
ভারতকে সুষ্পষ্ট ঘোষণা দিতে হবে অন্তত দুইটি বিষয়ে। এক. পার্বত্য চট্টগ্রামে সব ধরনের ইন্টারভেনশন বন্ধ রাখবে ও কোন রকম সশস্ত্র গ্রুপের সাথে সম্পর্ক রাখবে না। দুই. কোন অবস্থাতেই সীমান্তে গুলি চলবে না এবং তার নজির দেখাতে হবে। এরপরে, স্তরে স্তরে পানির নায্য হিস্যা, বাণিজ্য ঘাটতি, এইসব আলাপেও আন্তরিকতা দেখাতে হবে ভারতকে। এই ঘোষণাগুলো রাষ্ট্র হিশেবে বাংলাদেশের জনগনের মধ্যে কার্যক্ষেত্রে ভারতবৈরী যে মনোভাব, তা কমাবে। ফলত রাজনৈতিক দলগুলোও, যেমন বিএনপি জামাত, এমনকি ভারতপন্থি বইলা পরিচিতদের রাজনীতিও ভারতপক্ষ বা বিরোধিতার চাইতে আরো ডাইনামিক হবে। রাষ্ট্র হিশেবে ভারতও স্রেফ জনকনসেন্টহীন একটা দলমাত্রের অনৈতিক সমর্থক হিশেবে বিবেচিত হবে না বাংলাদেশের জনগনের কাছে। ভারত একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের উপরে নির্ভরতার চাইতে বেটার পলিটিক্যাল সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
একই সাথে, বাংলাদেশেরও রাজনৈতিক দলগুলোর সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি হতে হবে, তাদের ক্ষমতাকালে বাংলাদেশও ভারতের সশস্ত্র বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর সাথে কোনরকম সম্পর্ক রাখবে না ও আশ্রয় দেবে না। যেটিরে শেখ হাসিনা, বেশ নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ততার সাথেই বলতে সক্ষম হইছিলেন, বাংলাদেশের মাটি ভারতের শত্রুদের ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। যারে আমরা স্রেফ ঘোটপাকানির বাইরে পড়তে পারি নাই তখন।
উভয়ের এই সুষ্পষ্ট সিদ্ধান্ত ও ঘোষণা ছাড়া, রাষ্ট্র হিশেবে ভারতের সাথে রাজনৈতিক দল হিশেবে আওযামীলীগের যে একাট্টা ও অনৈতিক ঘোটপাকানি, তারে মোকাবেলা করা যাবে না। আবার, ভারতেরও রাষ্ট্র হিশেবে মুক্তি হবে না। আর আমরাও ভারতীয় পণ্য বর্জন ইত্যাদি জনপ্রিয় শ্লোগানে মশগুল থাকব। ভারত কি এই সমাধানেই নির্বাণ চায়?
একটা বিশ্বস্ত গুঞ্জন এরকম শুনলাম, যে, বিএনপির একটা প্রভাবশালী অংশ নির্বাচন পেছাতে চাইতেছে, এবং প্রস্তুতির জন্য আরো সময় চায়। আর একটা অংশ নির্বাচন ফেব্রুয়ারিতে চায় বটে, কিন্তু নির্বাচনে ওয়াকার আর তাদের দলীয় পেশির ব্যবহার নিশ্চিত করতে চায়। মানে, আর একটা হাসিনার নির্বাচন। আবার, নির্বাচন পেছাতে চাওয়া অংশ একটা জাতীয় সরকারের ধারণা প্রমোট করতে চাচ্ছে বইলাও একটা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, যেহেতু এই সময়টা পুরোপুরি ইন্টারিমের উপরে ছেড়ে দেওয়া যায় না। উভয় সম্ভাবনারই মূল কারণ, নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে পার্টির ভেতরে হঠাৎ অনিশ্চয়তা, যেইটারে বিএনপি প্রায় নির্ধারিত বইলা ধারণা করছিল। বিএনপির হঠাৎ নির্বাচন নিয়ে এই সিদ্ধান্তহীনতা আশঙ্কারই। এইসব গুঞ্জন পুরোপুরি অবিশ্বাস করার মতো না, কারণ, ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোর পরে, খেয়াল করলাম, নির্বাচন নিয়ে বিএনপির উচ্চবাচ্য কম এখন। এনসিপির শাপলা প্রতীক নিয়ে নতুন জটিলতা তৈরী করল নির্বাচন কমিশন, এইখানে সম্ভবত নির্বাচন পেছানোর একটা উদ্দেশ্য থাকতে পারে, যার দায় এনসিপির উপরে পড়তে পারে। এরকমই কি?
এরকম যদি হয়, ভবিষ্যৎ বলবে। আমি সাধারণত এই ধরনের গুঞ্জনগুলো নিয়া কোন আলাপ করি না, কিন্তু, গত কয়েকদিনের ঘটনাপ্রবাহ আমাকে ভাবাচ্ছে। বিএনপিকে বেশ অপ্রস্তুত মনে হচ্ছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কোলকাতার এক পত্রিকার সাক্ষাৎকার ও তা প্রকাশিত হবার পরে অস্বীকার ও এআই এর তৈরী বলে দাবী, তা এই অস্থিরতারই প্রকাশ। এখানে ফখরুল নির্বাচনে আওয়ামীলীগকে চেয়েছেন এবং জামাত ও এনসিপি নিয়ে সেনসিটিভ কিছু মন্তব্য করেছেন ও পত্রিকার রিপোর্টারকে আশ্বস্ত করার মতো ভাষা ব্যবহার করেছেন, পরে ফখরুল যা মিথ্যা বইলা দাবী করেছেন। ফখরুল অস্বীকার করলেও, এই অস্বীকারের অর্থ, তর্ক এড়াতে চাওয়ার ঘটনা হিশেবেই আমরা পড়ছি। একই সময়ে, জামাত নেতা তাহেরের আর কিছু কোট দেখা যাচ্ছে জনৈক ভারতীয় অধ্যাপকের বরাতে, যেখানে তিনি বলেছেন, জামাতের ক্ষমতায় আসার সাথে 'ইসলামী শরিয়া' নামের কিছুর সম্পর্ক নেই, এবং জামায়াতের নেতৃত্ব ভারতের সাথে সস্পর্কে আগ্রহী, ইত্যাদি।
ইন্টারেস্টিং হল, একই সময়ে দ্য উইক নামক মিডিয়ায় নাহিদেরও একটা ইন্টারভিউ এসেছে, যেইটারে আমার সবচেয়ে ভাল ও মেচিওরড মনে হয়েছে। এখানে নাহিদ ভারতকে বাংলাদেশ নীতি ও এক দলের সাথে সম্পর্ককেন্দ্রিক পুরনো বিচার পুনর্বিবেচনা করতে হবে বলে জানিয়েছেন। তো, এইসব সাক্ষাৎকার, বিশেষত ফখরুল ও নাহিদেরটা আমরা জানছি মাত্র গতকাল থেকে। কিন্তু এর মধ্যেই, নিউইয়র্কে আখতার, জারা ও মির্জা ফখরুলের উপরে হামলা হল ও ফখরুলের মত বর্ষিয়ান নেতারেও এর থেকে বাদ দেওয়া হল না। ফলে, এই হামলার পরে দল হিশেবে বিএনপির চিন্তা বদলাতে পারে বইলা আমার একটা ধারণা হইতেছিল। কিন্তু, আজকে রিজভি সাহেবের একটা ভিডিও দেখলাম, যেখানে এই ঘটনাটারেই পুরোপুরি মিথ্যা ভুয়া ও কন্সপিরেসি বলা হইতেছে। ফলে, বিএনপিরে একটা অস্থির বালকের মত মনে হইতেছে এখন, যার কিছু স্থিরতা প্রয়োজন।
ইন্টারেস্টিং ঘটনা হইতেছে, নিউইয়র্কে এইবার শুধু মাহফুজদের উপরে না, বর্ষিয়ান মির্জা ফখরুলের উপরেও হামলা হইছে। মাহফুজ আখতারদের উপর হামলা হবে, এইটাতো উনারা জানেনই, বরং এইটা জেনেই অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন, আর মির্জা ফখরুলরাও এইটারে নিয়তি হিশেবেই ঠিক করেছিলেন। কিন্তু, এই নিয়তি এইবার ফখরুলের উপরেও যে নাজিল হল, এইটা দুঃখজনক। এনসিপি নেত্রী তাসনিম জারার নারীত্বকে অপমান কইরা দলবদ্ধভাবে মব করা হয়েছে, এইটা নিয়ে কারো কোন আলাপ বা আপত্তি থাকবে না, এটাই স্বাভাবিকতা, যেহেতু আওয়ামীলীগ করেছে। বাংলাদেশে ইসলামিস্টদের ট্রেডিশনাল কথাবার্তায় আহত হওয়াটাই কেবল বাংলাদেশে নারী প্রশ্নে কথা চিন্তিতদের কাজ। তাদের জারার পাশে দাঁড়ানোর সময় হবে কেন? এই হামলার পরে, মুহাম্মদ ইউনুস প্রটোকল নিয়ে বের হয়ে গেলেও, আখতারের চমৎকার দৃশ্য দেখলাম। দাঁড়িয়ে শ্লোগান দিচ্ছে। ইতিহাসে আখতার, আখতারদের উদাহরণই পালটা ধাওয়া হয়ে ওঠার উদাহরণ। ফলে, আখতাররাই ইতিহাস তৈরী করেছিল। গতকালকেও। এইদিন, আরো চমৎকার দৃশ্য হতে পারত, এই মিছিলে আখতারের পাশে মির্জা ফখরুলকে দেখা যেত যদি। হাহা, এইটা সম্ভব না। কারণ, ফখরুল সাহেব এই হামলাকারীদের নির্বাচনে চান বইলা জানাচ্ছে কলকাতার এই সময় পত্রিকা। ফলে, এলাহি ভরসা।
ওয়েল। আলাদা কইরা জুলাই‚ বা একাত্তর ডিনায়াল নিয়েও আমার তেমন কোন মাথাব্যাথা নেই। উভয়ের কোনটাই আমার কাছে যেহেতু ধর্ম না। একাত্তর আমাদের অনেকের জন্যই গায়েব‚ যেহেতু চোখের সামনে ঘটে নাই। আর জুলাই হল‚ আমাদের চোখ ছেঁছড়ে দিয়ে‚ চোখের উপর রক্তের ফিনকি উড়িয়ে চলে যাওয়া ট্রেন। ধর্মে গায়েবের উপরে বিশ্বাসের একটা ব্যাপার আছে বটে। এইটা হল ঈমানের প্রশ্ন। এমন কি কবি হিশেবেও‚ আমি গায়েবে ঈমানের জরুরত বুঝি। যেমন‚ বিপ্লব বা প্রেম তো একটা গায়েবি সম্ভাবনাই। উভয়ে ঈমান রাইখাই অগ্রসর হইতে হয়। কিন্তু‚ একজন প্রায় সেকুলার মানুষ হিশেবে আমি হাজেররে দেখি, গায়েবেরও সবার আগে। হাজেরের প্রতি আপনার রেসপন্স কী, তা দিয়াই আপনার গায়েবরে ধরা সম্ভব।
ফলে‚ ডিনায়ালের প্রশ্ন না, যারা 'একাত্তর ভুলে যাওয়া' ধরনের দুশ্চিন্তায় আগ্রহী, যেমন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বা, তার দলের আরো বড়, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতা ফজলুর রহমান সাহেব‚ তাদের জন্য এই আলাপ। যে একাত্তর আমরা দেখি নাই, গায়েব, আপনি যখন তার গল্প বলছেন‚ এই গল্প যে ট্রুথ নির্মাণ করতে চায়, একজন সেকুলার মুমিন হিশেবে আমি তারে প্রশ্ন করি বটে। যেহেতু গায়েব মানে স্রেফ বিশ্বাস না, অবিশ্বাসেরও ব্যাপার।
কিন্তু, জুলাই তো গায়েব না‚ যা তাদের ভুলিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে‚ ফলে ভুলে যেতে বসেছেন। জুলাই তো মাত্র চোখের সামনে ঘটে যাওয়া মহাইতিহাস, কয়েকদিন আগে, জুলাই জাগরণ ও হাসিনার নেতৃত্বে হওয়া জেনোসাইডকে কল্পনা করার ব্যাপার না, চোখ দিযে দেখার ব্যাপারই ছিল। উভয়রে তারা কীভাবে দেখছেন? বা, দেখতে পাচ্ছেন কি?
এই প্রশ্ন, যে ইতিহাস আপনার চোখের উপরেই ঘটল, তারে কীভাবে নির্মাণ করবেন, সেই দার্শনিক মুহূর্তের প্রশ্ন না, যা আমরা করছি বহুদিন ধরে। তারো বহু আগে, হাজেরের প্রতি আপনার যে প্রাথমিক রেসপন্স, আপনি যে তারে দেখতেই সক্ষম না, স্রেফ ডিনায়াল, তার রিডিং। তো, যিনি চোখের সামনে ঘটা জুলাইয়ের রক্তজবা দেখতে পেলেন না‚ তার আবার একাত্তর কী?
দক্ষিণপন্থা, যখন দুর্ভাবনা আকারে আসে, তখন এইটা একটা আদর্শিক প্যানিক হিশেবেই হাজির থাকে। এর বাইরে, শহীদুল আলমদের 'ফার রাইট' এর একটা গন্তব্য, খেয়াল করলাম, ফার রাইটের আতঙ্ক ছড়িয়ে সিনেট প্রভৃতি নানান পদ দখলেরও টুল। মিডিয়াগুলোর আইডিওলজি এবং এসটাবলিশমেন্ট তো তাদের দখলেই। এই যে আদর্শিক আতঙ্ক ছড়িয়ে পদ দখলের আইডিয়া, এইটা, দেখা যাচ্ছে, বেশ ইফেক্টিভও। আবার, বিশেষ ইসলামপন্থীদেরও দখল অভিযানের অভিযোগ দেখা যায়। কিন্তু, এর ভেতরে, মির্জা ফখরুলের যে 'দক্ষিণপন্থা', এইটারে কিসের টুল বইলা মনে হয় আপনার? আমার মনে হয়, মির্জা ফখরুলের ক্ষেত্রে, বাকি টুলগুলোর চাইতেও অধিক ঘটনা হল, তার দক্ষিণপন্থা শুরুতে কওয়া পিওর আদর্শিক প্যানিকই। নোটটা ড্রাফট থেকে নিলাম।
আজ ২৮ জুলাই। মির্জা ফখরুলের 'বেদনায় নীল' এবং ছাত্রদের 'মানি মেকিং মেশিন' হয়ে ওঠা দিয়ে প্রথম আলোর মত পত্রিকার প্রথম পাতা ভর্তি। কাঁচাবাড়ি পাকা হওয়ার খবর নিয়াও মতওয়ারা দেখলাম, সবাই। সমকালে দেখলাম, 'যুবলীগ' থেকে এনসিপি নেতারে অব্যহতি দেওয়ার নিউজ। নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের এই নিউজ তো পত্রিকায় আসার কথাই না, এই 'নিউজ' কীভাবে ছাপাল সমকাল? সাধারণভাবে, এইসব ঘটনা তো নিউজই। কিন্তু, জুলাইয়ে যে পত্রিকাজুড়ে কভারস্টোরিতে এইসবই থাকছে, পত্রিকা বা জনপরিসরের এই ঘটনাগুলো স্বাভাবিক না। কোন পত্রিকাতেই, আমি খেয়াল করতে পারলাম না, জুলাইয়ের এই দিনে কী হইছিল, তারে নিয়া কোন স্মৃতিচারণ, ফিচার, বা সাক্ষাৎকার। আপনারা খেয়াল করতে পারলেন কি?
দক্ষিণপন্থা
প্রথম আলো, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই গানটা আমার ভাল লাগে। আপনাদেরও পইড়া আনন্দ হতে পারে —
:
উত্তর মেরু, দক্ষিণ মেরু সব তোমাদের জানা
আমরা শুনেছি সেখানে রয়েছে জিন ,পরী, দেও, দানা।
আমাদের যুগে আমরা যখন খেলেছি পুতুল খেলা
তোমরা এ যগে সেই বয়সেই লেখাপড়া কর মেলা।
আলাদা কইরা তারেক রহমানের আয়ের উৎস নিয়া আমার কোন আগ্রহ নেই। বরং রাজনৈতিক দলগুলোর আয়ের সোর্স এবং তাদের নেতারা যে সোর্স বিষয়ে গোপন রাখারে কর্তব্য মনে করেন, এইটা যে খারাপ দুয়ারগুলো খোলা রাখে, তার দিকে নজর দিতে চাই। সে কারণেই, ছাত্রদল সেক্রেটারি যখন রোজার সময়ে শিবিরের আয়ের উৎস নিয়া প্রশ্ন তুলেছিল, আমি তার পক্ষে কথা বলেছিলাম। আজকেও, খালেদ মুহিউদ্দীন যখন একই প্রশ্ন তারেক রহমান বা মির্জা ফখরুলের বিষয়ে করেছেন, তারেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি। যদিও, যেটুকু ক্লিপ শুনেছি, তাতে খালেদ প্রশ্নটি ঠিকঠাক তুলতে পেরেছেন মনে হয় নাই।
বিএনপির লোকেরা আম, সাধারণ মানুষ। যেমন, গ্রামগুলোতে ক্ষেত খামারের লোকজন, আর দিনমজুরও আছেন। জামাত করে লোকেরা অল্প বুদ্ধিজীবী ও এলিট। কিছু বইপত্তর, যেমন সিলেবাস পড়েন যেহেতু। উনারা মুসলমান সংস্কারবাদী। ফলে, তেমন মূর্খ, মানে অক্ষরজ্ঞানহীন পাবেন না। কিন্তু সংস্কৃতিহীন, সংস্কারবাদী হেতু। আর, বিএনপির সমর্থকরা মুসলমানি সংস্কৃতি লালন করেন বটে, কিন্তু সংস্কৃতির সংকটকে বোঝার মত মেচিওরড না। ফলে, তাদের তেমন কইরা কোন চেহারা পাবেন না কোথাও। ফলে, উভয়ই ব্রাত্য এইখানে। যেমন, প্রথমে জামাত শিবির ও পরের দিকে বিএনপি জামাত উভয় রাজনৈতিক দল ও তাদের কর্মী ও সমর্থক গোষ্ঠি যে পরিমাণ টার্গেটেড গুম খুন ও নির্যাতনের স্বীকার হইছে হাসিনার আমলে, এইসবরে নিয়া বহু কালবেলা কালপুরুষ হইতে পারত। কিন্তু কিছুই হবে না, বরং ভুলে যাওয়া হবে। কিছু পার্টিজান কাজ হয়তো হবে, তা আবার দলগুলোর সিলেবাসে পড়ানো হবে। চব্বিশের অভ্যুত্থানও যেহেতু এই দুই দলের দলছুটেরাই বেশি, দেখবেন, তাদের জন্য কোন গান আর কবিতা নেই তেমন কইরা সংস্কৃতিমহলে। কালচারাল হেজিমনিতে তারা ব্রাত্য রহিয়া যাবেন। আর, বিএনপি বা জামাত উভয় দলের তর্কগুলোতেও, দেখবেন, এমন কি রাষ্ট্রই নেই। আর সব আছে। রাজনীতিতে তো কমন শত্রু দরকার। তো, আওয়ামী লীগ চলিয়া যাওয়ার পরে উনাদের কমন শত্রু যেহেতু অনুপস্থিত, উনাদের রাজনীতিও স্রেফ পুরনো আওয়ামী লীগ আর আওয়ামীলীগ খেলাতেই মগ্ন রহিল। যেমন, জামাতকে মোকাবেলায় আওয়ামীলীগের রেথরিকগুলো বিএনপি ব্যবহার শুরু করেছে, দেখবেন। আর জামাত, ইসলামী দল থেকে মোর মডারেট চেহারা দেখানোর চেষ্টা করছে হঠাৎ, যা আদৌ তারা নয়। তবে, তারা হয়ে উঠতে যদি পারে, এইটা ভাল হতে পারত। তবে তাদের আরো সমস্যা আছে, যেমন একাত্তর প্রশ্ন। একাত্তরের পরে, তাদের রাজনীতিতে অবস্থান পরিবর্তনের থিসিস নেই। এইটা তাদের ভোগাবে, যখন সময় আরো যাবে, এবং ক্ষমতার চরিত্র পরিবর্তন হবে, তখন। তবে, বিএনপি যদি আওয়ামীলীগের রেথরিকগুলোতেই থিতু হয়, এইটা অন্য ঘটনা ঘটাবে। আওয়ামীলীগের অনুপস্থিতি এর সমর্থকদের মধ্যে যে ভেকুয়াম তৈরী করছে, তা পূরণ করবে কিছুটা। বিএনপি, মানে মির্জা ফখরুলের চেহারায় পুরনো আওয়ামীলীগ ফিরবে। তারা বিএনপিতেই আওয়ামীলীগরে খুঁজে পাবে। তবে, রাজনীতিতে পুরনো বিএনপির অনুপস্থিতিটা, নয়া ভেকুয়াম তৈরী করবে। বিএনপির সেই পুরাতন ইসলামী মূল্যবোধ আর বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের খালি স্পেইসটা নতুন রাজনীতি যারা চাহেন, যেমন বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, তাদের জন্য সুখকর হবে। তারা উদারতার সাথে এইটারে কাছে টেনে নিতে পারবে। মানে, চব্বিশ বেশ ভাঙচুর করবে। স্রেফ আওয়ামীলীগে না। সবখানে।
.....
এই আলাপটা জানুয়ারিতে করেছিলাম। আবার পড়েন।
বিএনপি হল গণঅভ্যুত্থান পরবর্তি সময়ে আমাদের সবচেয়ে বড় মন খারাপের দলগুলোর একটি। কেন এত সফট 'মন খারাপে'র কথাই বলছি, এইটা ইদানীংকার মুখস্ত বিএনপির বুদ্ধিজীবী, কম বয়সি একটিভিস্ট বা ভাড়াটে বটরা বুঝবে না। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর নিয়া আমাদের আলাপ দীর্ঘদিনের আর হাসিনার শাসনে মজলুম হিশেবে বিএনপির প্রতি দীর্ঘ সমর্থন ছিল আমাদের। ধর্মীয় শক্তি নয়, কিন্তু উদার ধর্মীয় টলারেন্ট সোসাইটি আর ধার্মিকদের সেকুলার প্লাটফর্ম হিশেবে হাসিনার ফ্যাসিবাদের বিপরীতে বিএনপির উত্থান চেযেছি আমি সব সময়। আমাদের সেই চাওয়ার বয়স এদের অনেকের বয়সের চাইতেও বেশি।
ফলে, খালেদা জিয়ার হস্তক্ষেপে ইউনুস বিষয়ে বিএনপির অবস্থান পরিবর্তনের নিউজটা, যদি সত্য হয়, একটু খুশির ব্যাপারই। কারণ, আমি মনে করতাম, বিএনপি যেহেতু বড় ও ঐতিহ্যবাহী দল, ছাত্রদের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থানের পরে হাসিনা পরবর্তি সময়ে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর যে কনসেনসাস ও ঐক্য দরকার ছিল, বিএনপি ছাত্রদের অভ্যুত্থানকে ঔন করে তার কেন্দ্র ও অভিভাবক হওয়ার সুযোগ নেবে। এই ভূমিকার মাধ্যমে বিএনপি জুলাই পরবর্তি রাজনীতিতে তরুণদের কাছে সবচেয়ে ইনফ্লুয়েনশিয়াল দল হিশেবে আবির্ভূত হতে পারত। কিন্তু, খালেদা জিয়ার মতো অভিভাবকতুল্য নেতার হাজির না থাকার কারণেই সম্ভবত এই ঘটনা ঘটতে পারে নাই। অভ্যুত্থানকে ঔন করার পরিবর্তে বিএনপি নেতৃত্ব ফজলুর রহমান প্রমুখ হঠকারীকে সামনে আনার মাধ্যমে তরুণদের জুলাই জাগরণকে ডিজঔন ও ডেমনাইজেশনের দাযটাই নেওয়া কর্তব্য মনে করেছে। যার কারণে আমাদের দলগুলোর ভেতরে হাসিনা পরবর্তি কনসেনসাস ও ঐক্য দৃশ্যমান হতে পারে নাই, শুধু তাই নয়, বরং ফজলু ধরনের এলিমেন্টগুলোর মাধ্যমে একই সাথে গণঅভ্যুত্থান, ছাত্র অভ্যুত্থানের নেতারা আর ইউনুস, সবকিছুর প্রতি আওয়ামী ভাষা ও ভঙ্গিতে বিদ্বেষ তৈরী করেছে বিএনপি মহলে।
এই অবস্থায়, যদিও বিএনপি পুরনো চরিত্রের ক্ষমতার একাট্টা অধিকার চাচ্ছে বইলাই মনে হচ্ছে, কিন্তু বিএনপির এই একাট্টা ক্ষমতার বিরোধিতার সাথে সাথে আমাদের মনে রাখতে হবে, বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই ও গুম খুনেরও শিকার ছিল এবং সেই হিশেবে আমাদের গণতান্ত্রিক হোপেরও অংশ। বিএনপি নেতা তারেক রহমান ও খালেদা জিয়ার প্রতি হাসিনার জুলুম ও তার অভিজ্ঞতারে আমি আব্রাহামিক ঐতিহ্যের সাফারিংস হিশেবে আলাপ করেছিলাম, যার থেকে নতুন জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় উত্তরণ হওযা সম্ভব। তো, এইসব বিবেচনা কইরা বিএনপি যদি একাট্টা ক্ষমতাচর্চার বাইরে আইসা দাঁড়াতে রাজি হয় ও গণঅভ্যুত্থানকে ধারণ করতে আগ্রহী হয়, বিএনপিকে ওয়েলকাম জানানো উচিত। ঐক্যের জায়গাগুলোও সব সময় খোলা রাখা দরকার।
ইউনুস বা ইন্টারিমকে প্রতিপক্ষ কইরা বিএনপির যে কোন লাভ নেই, শুনলাম, খালেদা জিয়া এই নির্দেশ দিযেছেন। এটাই যদি হয় খালেদা জিয়ার হস্তক্ষেপ, তাহলে খালেদার প্রজ্ঞার প্রতি বহু বছর পর ভরসা রাখতে পারলাম আবার। জিয়াপুত্র তারেক রহমানকে ধৈর্যশীল মনে হইত, কিন্তু এখন পর্যন্ত অভ্যুত্থান পরবর্তি বিএনপির রাজনীতিকে কোন দারুণ দিশা দিতে পেরেছেন, এমন মনে হল না। আশা করছি, তারেকের ভবিষ্যত এখনো মাত্র শুরু হচ্ছে। নিশ্চয়ই তারেক খালেদার এই প্রজ্ঞারে মূল্য দেবেন, এমনটাই আশা করছি। যদি এরকম হয়, তাহলে লন্ডনে ইউনুসের সাথে তারেকের মিটিং এর ঘটনারে আমি, ভাল হিশেবেই নিতে চাই, যদিও প্রথমদিন এইটার বিরোধিতা করছিলাম। মির্জা ফখরুলও বলছেন দেখলাম, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ড. ইউনূস-তারেক রহমান সাক্ষাৎ ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হতে পারে। ভাল। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল, এই টার্নি পয়েন্ট উনারা এতদিন তৈরী করতে ব্যর্থ হলেন কেন? উনারা কি স্থায়ী কমিটিতে কেবল প্রভুভক্ত দাস হইয়া রহেন?
ইন্টারেস্টিং হল, বিএনপি সমর্থক এবং বুদ্ধিজীবীরা 'ফকিন্নি' ধারণার বাইরে বাংলাদেশের জনগনকে ভাবতে প্রস্তুত না। বুদ্ধিজীবীদেরকে তো দেখিই। আজকে এক সমর্থকের কমেন্টও দেখলাম, যেখানে তিনি 'ফকিন্নির পোলাদের' উদ্দেশ্য কইরা বলছেন, ঢাকা হচ্ছে ইশরাকের 'বাপের তালুক'। ফলে, সাবধানে কথা কইতে হবে। মানে, 'হাসিনার বাপের তালুক' থেকে 'অন্য কারো বাপের তালুক' পর্যন্ত তাদের যে জার্নি, তার পথে পথে, যেমন জুলাই অভ্যুত্থানে প্রাণ দেওয়া মানুষগুলো হল ফকিন্নিই। আর উনারা জমিদারের তালুকের চৌকিদার।
এই ঘটনা থেকে অনুমান করলাম, বিএনপির বেশির ভাগ নেতাই জমিদারের পোলাই হবেন। যেমন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মির্জা আব্বাস। ইত্যাদি। কিন্তু, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান তো, আমি যদি ভুল না কইরা থাকি, জমিদার বংশ না। তার পরিচয়ও শুরু হয়েছিল সামান্য মেজর দিযে, অন্তত আমরা যে মেজর জিয়াকে চিনি। তারেক রহমান কি সেই মেজর জিয়ার পরিচয সাবস্কাইব করেন, নাকি বাপের তালুকের জমিদারদের সাবস্ক্রাইব করেন, জানা তো হল না এখনো। তবে, উনার প্রশ্রয় অনেক ইশারাই দেয় আমাদের। তা আমাদের পড়তে পারার ব্যাপার আছে আর কি!