কারে ভোট দেবেন? গ্রামে ফিরতে ফিরতে, গাড়িতে বইসা এই নোট করছি। বাইরে রাত গভীর হতেছে৷ কালই তো ভোট। এইটা নিশ্চয় ঠাণ্ডা রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সময় না। আপনারা তো নিজেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন, এই লেখা আমাদের সেইসব বন্ধুদের জন্য, যারা এখনো আমার মতই এথিকাল ডিলেমাগুলোরে গুরুত্ব দেওয়া দরকার মনে করেন৷ তো, এই নোটটি হয়ত সেইসব ডিলেমারে বাড়িয়েই দিতে হেল্প করবে। দেখা যাক। প্রথম যে ঘটনাটি আমারে ভাবাচ্ছে, এই ভোট নাগরিক হিশেবে আমাদের কনফিউশনগুলোর জবাব দিতে সক্ষম কিনা, আমি নিশ্চিত না। যেমন, গণভোটের উদ্দেশ্য ও কারণরে মানুষের কাছে পরিস্কার করতে স্পষ্টভাবে ব্যর্থ হইছেন ইউনুস ও রাজনৈতিক দলগুলো। ফলে, গণভোটের যে ফলাফল, তা তেমন কইরা মানুষের মতামতকে ধারণ করতে সক্ষম না, আমার পর্যবেক্ষণ বলে৷ আমার এথিকস বলে, ইউনুসের এই ব্যর্থতা বা রাজনৈতিক দলগুলোর এই ক্ষেত্রে অনিহারে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের রাতের ভোটগুলোর গন্তব্য স্পষ্ট ছিল। এখন যে ভোট হতেছে, তার গন্তব্য স্পষ্ট না।
বাংলাদেশে এখন তিনটা সেকুলার দল নির্বাচনে। এনসিপি, বিএনপি ও জামাত। অবাক হয়েন না, জামাত যে একটা মোটামুটি সেকুলার দলই, কোন ধর্মরাষ্ট্র বা শরিয়া তাদের গন্তব্য না, এরকম একটি ধারণা তারা নিজেরাই দেওয়ার চেষ্টা করেছে নানান ভাবে। জামাতের এই দাবীর অথেনসিটি নিয়া সন্দেহসহই আমি তাদেরে লক্ষ্য করতে চাই। আমি খেয়াল করেছি, বহু বছর ধইরা হাসিনার অধীনে টিকে থাকতে গিয়ে তারা মানুষের কাছে যাবার ও সেকুলার হয়ে উঠতে চাওয়ার এই মেচিওরিটি অর্জন করেছে। এইটা, আমার ধারণা, তারা খালেদা জিয়ার বিএনপি থেকে শিখেছে। ফলে, জামাতের ছাত্রসংগঠন বিষ্ময়করভাবে প্রায় সবকটি ছাত্রসংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করেছে, যেখানে তাদেরকে ভোট দেওয়া সবাই তাদের সমর্থক হবার সম্ভাবনা অতি কল্পনা হবে। তবে, এখন, জাতীয় নির্বাচনে জামাতের বিজয়ের যে হাইপ উঠতেছে, তারে আমার রিয়েলিটির চাইতে প্রচারণার রাজনীতিই মনে হয়। তাদের সফলতা হল, তারা এই রাজনীতিগুলো দিয়ে জনগোষ্ঠির বড় অংশকে ভালো প্রভাবিত করতে পেরেছে। আগে সাধারণ মানুষ বিএনপির কথা কইত, এখন, প্রায়ই খেয়াল করি, দাঁড়িপাল্লা পরিচিত হয়ে উঠেছে। এর দুইটা কারণ হতে পারে। তাদের জনসমর্থন বেড়েছে। অথবা, রিকসাওয়ালা বা গরিব শ্রেণীর ভেতরে তাদের কাজ বেড়েছে। তবে, জাতীয় নির্বাচনরে ছাত্র সংসদের মত ম্যাজিক হিশেবে না ভাবলে, আমার অনুমান হল, বিএনপি ভাল আসন নিয়ে জিতবে। তবে, বিএনপির এবসলিউট সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়া আমার ভয় আছে। আমার বুঝমতে, জামাতের এবসলিউট সংখ্যাগরিষ্ঠতা সম্ভব না তেমন কইরা। সম্ভাবনা থাকলে, এইটাও ভয়ের ব্যাপার হইত।
ভোটার হওয়ার পর থেকে, প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়াই ধানের শীষ ছাড়া অন্য কোথাও ভোট দেই নাই আমি। যদিও কখনোই বিএনপি বা এই ধরনের কোন নির্দিষ্ট পার্টির সমর্থক থাকা সম্ভব না আমার পক্ষে। তা সত্বেও, সেই সময় আমাদের প্রতিপক্ষ ও ইভিল পরিস্কার ছিল। হাড়ে মজ্জায় সাম্প্রদাযিক বাঙালি জাতীযতাবাদ, ফলে জিয়া বাংলাদেশি পরিচয়রে সামনে নিয়ে আসল। আর, একটা দীর্ঘ সময় বিএনপি ছিল মজলুম। ফলে নির্বাচনের সময়ে তাদের সাথে আমার, বা আমাদের বন্ধুত্বগুলোও পরিস্কার ছিল। এখন এইটা অত পরিস্কার না আসলে। বিএনপি বা তারেকের ব্যর্থতা হল, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেও তাদের নয়া বন্ধুত্বের চরিত্র কেমন, এইটা পরিস্কার করতে ব্যর্থ হইছেন উনারা। গণভোটের মৌলিক পরিবর্তন নিয়া স্পষ্ট কথা কইতে দ্বিধাগ্রস্ত থেকেছে দীর্ঘ দিন, আবার, তাদের ইশতেহার হাঁ এর প্রস্তাবনাগুলোর বিপক্ষে। বিপরীতে, এগার দলীয় জোট এই ক্ষেত্রে রক্ষণশীল ছিল না। সংস্কার প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান নিতে পেরেছে, শুরু থেকেই। শুধু এগার দলীয় জোট না, অন্য ইসলামী দলগুলোও। কিন্তু, একটি অতীতে ধর্মরাষ্ট্র চাওয়া দল নিয়া আমার অস্বস্তি আছে। তাদের ভেতরকার একটা দ্বন্দ্ব আমি খেয়াল করি, একাত্তর ইস্যুতে, যেইটা তারা সমাধান করতে ইচ্ছুক না। নারী প্রশ্নে প্রগ্রেসিভ অবস্থান নিতে না পারার ব্যাপার আছে। যদিও নাহিদ ইসলাম কোন একটা ইন্টারভিউতে পরিস্কার করেছেন, তাদের জোট ক্ষমতায় আসলে ধর্মরাষ্ট্র হবে না৷ আবার, নির্বাচনের আগে আগে বিএনপির মাসলপাওযার ও হুমকিগুলো অতীত আওয়ামীলীগকে মনে করিয়ে দেয়। তবুও, আমার ভোট এ বছর বিএনপি বা জামাত উভযেরই না পাওযার যথেষ্ট সম্ভাবনা ও কারণ হাজির আছে। আমার আসনে এনসিপি থাকলে চোখ বন্ধ কইরা এনসিপিরে ভোট দিতে পারতাম, অতীতে যেভাবে বিএনপিরে দিতাম।
ভোটকেন্দ্রে যদি শেষমেষ সুস্থ শরীরে পৌঁছাতে পারি, বিসমিল্লাহ বইলা এইসবই মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নেব, যদি আল্লাহ বাঁচিয়ে রাখেন। আমি চাইব, উনিশ শ তিয়াত্তর সালে রাষ্ট্র বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নির্বাচনে প্রফেসর আনিসুজ্জামানের যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, আমার সেই অভিজ্ঞতা না হোক। উনি নিজের ভোট দিতে পারেন নাই, উনার ভোট মুজিব দ্বায়িত্ব নিয়া দিয়ে দিছিলেন। আপাতত, আমার আকাঙ্ক্ষা থাকবে, আমার ভোটটি যাতে আমিই দিতে পারি, মুজিব আইসা না দিয়ে যান। এরপরে, শাসন ক্ষমতায় কে আসবে, তার চাইতে গুরুত্বপূর্ণ হল, নির্বাচনে যে দলই জিতুক, বিএনপি বা জামাত, তাদের কাছে আশা থাকবে, তারা অন্তত এই দুই বছরের সমন্বিত অর্জন, জুলাই সনদ থেকে পেছাবে না। তবে, এইটারে লিমিট হিশেবে নেবে না, সামনে এগুবে। প্রত্যেক দলই একটা ভাল বিরোধী দল হিশেবে থাকার প্রস্তুতি নেবে, যদি পরাজিত হয়। বিএনপি বা জামাত, কাউরে নিয়াই আলাদা কইরা আমার কোন রক্ষণশীলতা নেই, উভয়ের ব্যাপারেই স্পষ্ট দ্বিধা আছে আছে। এই দ্বিধাগুলো তারা দূর করবে। আমাদের সামনে নানান রকম ধর্ম কইরা তোলা গৃহযুদ্ধের কুয়ারে বড় কইরা তুলবে না উভয়েই। ভবিষ্যতের পথ স্পষ্ট করবে, অতীতে ফিরে যাওয়ার গলি ঘুপচি না। শুভ ভোটিং। আর, অবশ্যই হাঁ ভোট দেবেন।
ছবি: বাড়িতে পৌঁছুলাম শেষমেষ। এইটা আমাদের ঐতিহাসিক পুকুরঘাট, হাওয়াখানা নাম।